বাংলাদেশে শক্ত অবস্থান একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রায় সময়ই নানা পক্ষ এমন ‘শক্ত অবস্থান’ নিয়ে থাকেন। কখনও কর্তৃপক্ষ নেয়, কখনও সরকার নেয়, কখনও প্রশাসন নেয়, আবার কখনও সাধারণ মানুষও নেয় এ অবস্থান। তাই এই বঙ্গের বাঙালির জীবনে ‘শক্ত অবস্থান’ খুবই ক্লিশে একটি বিষয়।
তবে সব সময় যে জাতীয় জীবনেই ‘শক্ত অবস্থান’–এর প্রদর্শনী দেখা যায়, তা কিন্তু নয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ব্যক্তি পর্যায়েও এমন ‘শক্ত অবস্থান’ আমাদের প্রায় সময়ই নিতে হয়। ব্যক্তি পর্যায়ের আবার দুটি ভাগ। একটি পেশাগত, অন্যটি একান্তই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক।
পেশাগত ক্ষেত্রে অফিস–আদালতে বা ব্যবসা–বাণিজ্যে মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, সহ্য আর করা যায় না! ধরুন, অফিসে দিনের শুরুতেই বস একগাদা কাজ কিছুটা জোর করেই আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। হয়তো এ অজুহাতও দেওয়া হলো যে, ‘আপনি তো কাজ ভালো করেন। আমাদের স্টার এমপ্লয়ী। প্লিজ, এগুলো করে দেন।’ ওদিকে একই সময়ে আবার আপনার অন্য সহকর্মী ঠিকই ফাঁক বুঝে আয়েশ করছে। তখন কিন্তু আপনার মনে হতেই পারে যে, এনাফ ইজ এনাফ! যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। এবার আপনার ‘শক্ত অবস্থান’ নিতেই হবে।
আবার একান্ত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনেও এমন শক্ত অবস্থান গ্রহণের মুহূর্ত চলে আসে। হয়তো আপনি ছুটির দিন সকালে একটু আয়েশ করে ঘুম দিতে চাইছেন বা বাজার করে সময় ‘নষ্ট’ করতে চাইছেন না, অথচ পরিবারের মানুষজন সেই ‘মৌলিক’ অধিকারে বাধা দিচ্ছে প্রবলভাবে! ওই ধরনের পরিস্থিতিতে তাই ‘শক্ত অবস্থান’ নিতেই হয়। বলতে হয়, ‘না, আমি করব না।’
আরও পড়ুন:
এভাবেই নানা বাস্তবতায় এ দেশে শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এমন অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু কৌশল আছে। এবার সেসব কৌশল নিয়েই আলোচনা হবে।
সুতরাং, চলুন, জেনে নেওয়া যাক সহজে ‘শক্ত অবস্থান’ নেওয়ার কিছু উপায় সম্পর্কে।
প্রথমত, আপনি যে শক্ত অবস্থান নিচ্ছেন, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। অবস্থান শক্ত হয়ে যাক, বা শক্ত হওয়ার আগের অবস্থাতে থাকুক না কেন, আপনার ব্যাপক প্রচারের পদক্ষেপ অগ্রিমভাবে নিতে হবে। প্রয়োজনে বিবৃতি দিতে হবে, মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দুনিয়ার সবাইকে জানাতে হবে যে, আপনি শক্ত অবস্থান নিতে চলেছেন। এরপর আদৌ নিতে পারলেন কিনা, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু সবাইকে জানিয়ে ফেলাটাই আসল। কারণ এ দেশে প্রচারেই প্রসার ঘটে।

দ্বিতীয়ত, প্রচারেও প্রসারের পাশাপাশি আপনার শক্ত ভাবমূর্তি মূর্ত হয়ে উঠতে না পারলে অন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এবার কিছুটা ফিজিক্যাল হতে হবে। অফিসে শক্ত অবস্থান নিতে হলে, সেখানেই তৎক্ষণাৎ স্থানু হয়ে যেতে হবে। বাসায় নিতে হলে সেখানেও একই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ধরুন, অফিসের ডেস্কের উপরে উঠে একেবারে গেঁড়ে বসে গেলেন। একটুও নড়া যাবে না। মুখভঙ্গি থাকবে কঠিন, কঠোর। এভাবে অফিসে শক্ত অবস্থান নেওয়ার একটি শরীরী প্রদর্শনী দেখাতে হবে। অন্যদিকে বাসায় হয়তো আপনাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার কথা বলা হতে পারে। উঠতে না চেয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে চাইলে একেবারে মরার মতো শুয়ে থাকতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার গায়ে পানি ঢেলে না দেওয়া পর্যন্ত বা লাথি দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে না দেওয়া পর্যন্ত এই শক্ত অবস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, শক্ত অবস্থানে অনড় থাকা সব সময় সম্ভব না। অন্তত এই দেশে তো নয়ই। তাই যে কোনো সময় গ্রানাইটের মতো শক্ত অবস্থান থেকে একেবারে কাদামাটির নরমে যেন নেমে যেতে পারেন, সেই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, শক্ত অবস্থান নেওয়াটা যেমন এ দেশে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শক্ত অবস্থান থেকে সুবিধামতো পিছলে পড়াটাও অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:
চতুর্থত, যারা আপনার শক্ত অবস্থান নেওয়ার খবরকে পাত্তা দেবে না, তাদের এড়িয়ে চলুন। এই এড়িয়ে চলা শেখাটা খুবই প্রয়োজন। ধরে নেবেন, যে আপনাকে পাত্তা দিচ্ছে না, আপনিও তাদের পাত্তা দেবেন না। তা তারা যতোই যুক্তিসংগত কথা বলুক না কেন। মনে রাখবেন, যুক্তিতে এ দেশে মুক্তি মেলে না। তাই পুরোপুরি অযৌক্তিক উপায়ে কাজ করার চেষ্টা চালান। এক্ষেত্রে সব সময় কাক’কে পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই বঙ্গেই জনশ্রুতি আছে যে, কাক নাকি বিপদ দেখলেই চোখ বন্ধ করে চুপটি করে বসে থাকে। চোখ বন্ধ করেই কাক মনে মনে ভেবে নেয় যে, কোথাও কোনো বিপদ নেই, সবকিছু ঠিকঠাক আছে! এভাবে এক ধরণের কল্পিত স্বস্তি সৃষ্টি করে নিজেকে হাবিজাবি বুঝিয়ে দেয় কাক। শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে হবে। এতে দেখবেন চারদিকে শুধু শান্তি, আর শান্তি!
পঞ্চমত, কোনো কিছুতেই যদি শক্ত অবস্থান নেওয়ার বিষয়টা প্রমাণ করতে না–ই পারেন, তবে আছে একটি চূড়ান্ত সমাধান। হয় হয়, অনেক সময় গরিবদের এমন অবস্থা হয়। কেউই পাত্তা দিল না, আপনার শক্ত অবস্থানের কাঠিন্য অনুভব করতেও পারল না। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শুরুতেই ভেবে নেবেন যে, পাগলের সুখ কিন্তু মনে মনেই! তাই নিজের দুটি পা একটা গামলায় দিয়ে ইট–সিমেন্ট দিয়ে একেবারে ঢালাই করে ফেলুন। উপযুক্ত সময় দিন ঢালাই শক্ত হওয়ার জন্য। সময় শেষে দেখবেন আপনার একটি দারুণ ও টেকসই ‘শক্ত অবস্থান’ তৈরি হয়ে গেছে!
এরপর সব নিন্দুকদের উদ্দেশে শুধু গলা ছেড়ে (টিপেও ধরা যায়) বলুন—‘খেলা হবে!’
রম্য থেকে আরও পড়ুন:


বাংলাদেশে আসতে পারে টিসিসি, রোমাঞ্চিত ট্রাম্প!
‘মধু হই হই আঁরে বিষ খাওয়াইলা!’ 
