ডায়ানা সালাজার, ইকুয়েডরের একজন নারী অ্যাটর্নি জেনারেল। সম্প্রতি তাঁর নিরাপত্তা দলের সদস্যরা ডায়ানার গাড়ি অনুসরণ করতে থাকা একটি মোটরবাইক দেখতে পান। মোটরবাইকটিতে ছিলেন দেশটির এক মাদকসম্রাটের বোন, যার বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন ডায়ানা। অবশ্য এ ঘটনায় মোটেও অবাক হননি ডায়ানা। তাঁর কাছে এটি যেন রুটিনমাফিক ঘটনা।
গত পাঁচ বছরে মাদক পাচারকারীদের দখলে ইকুয়েডর। এক সময়ের শান্তিপূর্ণ দেশটি বর্তমানে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে সহিংস দেশে পরিণত হয়েছে। ডায়ানা সালাজার অপরাধীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু বলা যায়। কারণ তিনি ইকুয়েডরের রাজনীতিক, বিচারক ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত করছেন।
আগামী ১৩ এপ্রিল দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে ভোট দেবেন ইকুয়েডরবাসী। দেশটির বর্তমান নেতা ড্যানিয়েল নোবোয়া এবং বামপন্থী আইনজীবী লুইসা গঞ্জালেজের মধ্যে দ্বিতীয় দফা ভোটে একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা হিসেবে আছেন সাবেক প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া। এই ভোটের ফলাফল ডায়ানার তদন্তের এক প্রকার ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে বলা যায়। কারণ, তাঁর ছয় বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৮ এপ্রিল। তাছাড়া রাফায়েল কোরেয়া ও তাঁর জোটের সদস্যদের ডায়ানা সালাজারকে খুব একটা পছন্দ নয় এবং তাকে প্রতিহত করতে চাইছেন বলা যায়।
২০১২ সালে মাদককারবারী লিয়ান্দ্রো নোরেরো কারাগারে খুন হন। তাঁর মোবাইল ফোনে হাজার হাজার এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, তিনি পুলিশকে প্রমাণ লোপাটে অর্থ দিয়েছেন এবং বিচারকদের মাদক পাচারকারীদের মুক্তি দিতে ঘুষ দিয়েছেন। এই মেসেজগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়, নোরেরো তাঁর ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে এক বিচারককে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন যাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট কোরেয়ার শাসনামলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ গ্লাস কারাগার থেকে মুক্তি পান। নোরেরোর সেলে থাকা এক বন্দী জানান, নোরেরো কোরেয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং গ্লাসের মুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। যদিও কোরেয়া এই দাবি অস্বীকার করেছেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ডায়ানা সালাজার এবং তাঁর টিম ৭৬ জনকে অভিযুক্ত করেছেন, যাদের মধ্যে সাবেক আইনজীবী, বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং কারাগারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। কয়েকজন অপরাধ স্বীকার করার পর শাস্তি কম পেয়েছেন।
সাবেক প্রেসিডেন্ট কোরেয়া একাধিকবার পোস্ট করে ডায়ানার আইনজীবী দলের তদন্ত সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ডায়ানাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন কোরেয়া।
ডায়ানা সালাজারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল কোরেয়াস্তার পক্ষ থেকেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে ডায়ানার দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের আক্রমণ জাতিগত পরিচিতির কারণে হতে পারে, কারণ তিনি ইকুয়েডরের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী। নিজেকে দলগত পক্ষপাতিত্বের বাইরে উল্লেখ করে ডায়ানা জানান, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া তাঁর দায়িত্ব।
এই ধরনের সততা ও সাহসিকতার জন্য ডায়ানা ইকুয়েডরে বেশ সম্মানিত। তাকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে তিনি কখনো রাজনৈতিক পদে দাঁড়াতে চান না। এই অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, বিচার বিভাগ এবং রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে মেশানো উচিত নয়। ইকুয়েডরকে মাদককারবারীদের দেশ হিসেবে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না, এটিই ডায়ানা সালাজারের অন্যতম লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, রয়টার্স



