বাংলাদেশে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামীর দ্বারা সংঘটিত হয়। এই সহিংসতা শারীরিক, মানসিক, যৌন, অর্থনৈতিক বা এমনকি সামাজিক হয়েও হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, নারীরা এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। রাষ্ট্র নারীকে সুরক্ষা দিতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এবং ‘ঘরোয়া সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ সহ একাধিক আইন প্রণয়ন করেছে।
আইনি প্রতিকারসমূহ:
১. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০
এই আইনের অধীনে স্বামীর দ্বারা স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মারধর, পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়। এই আইনে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যেমন:
- গুরুতর আহত করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড।
- যৌতুকের কারণে মৃত্যু হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড।
২. ঘরোয়া সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০
এই আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আইন, যেখানে শারীরিক ছাড়াও মানসিক, আর্থিক এবং যৌন নির্যাতনকেও সহিংসতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এই আইনের অধীনে নারী নিম্নোক্ত সহায়তা চাইতে পারেন:
- সুরক্ষা আদেশ (Protection Order): নির্যাতক স্বামীকে নির্যাতন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া।
- বাসস্থান আদেশ (Residence Order): নারীর নিজ ঘরে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করা।
- ক্ষতিপূরণ আদেশ: ক্ষতিগ্রস্ত নারীর চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও আর্থিক ক্ষতি পূরণের নির্দেশ দিতে পারে আদালত।
এই আইন অনুযায়ী নির্যাতনের অভিযোগ দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট থানা বা স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিসে যোগাযোগ করা যায়।
৩. পারিবারিক আদালত আইন, ১৯৮৫
নারী যদি স্বামীর নির্যাতনের কারণে সংসার চালাতে না পারেন, তবে তিনি পারিবারিক আদালতে গিয়ে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। এছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর আদায়, সন্তানের হেফাজত ইত্যাদির বিষয়েও মামলা করা যায়।
নারীর করণীয়:
- প্রমাণ সংগ্রহ: নির্যাতনের প্রমাণ যেমন ছবি, অডিও, ভিডিও, চিকিৎসা রিপোর্ট, প্রতিবেশীর সাক্ষ্য ইত্যাদি সংরক্ষণ করা জরুরি।
- আইনি সহায়তা গ্রহণ: উপজেলা ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, নারী সহায়তা কেন্দ্র বা বেসরকারি সংগঠনের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়।
- থানায় জিডি বা মামলা দায়ের: সরাসরি থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অথবা মামলা করা যায়।
- নিরাপদ আশ্রয়: সরকার ও এনজিও পরিচালিত মহিলা হোস্টেল বা সেফ হোমে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া যায়।
পারিবারিক সহিংসতা কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। সমাজে নারীর মর্যাদা রক্ষায় এবং সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। যে কোনো নির্যাতনের শিকার নারীকে ভয় না পেয়ে আইনগত পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় এবং ভবিষ্যতে অন্য নারীও উৎসাহ পায়।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


দেশে আবারও বেড়েছে ধর্ষণ, বেড়েছে আত্মহত্যাও
