ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে, তিনি একজন নিঃসঙ্গ শেরপা, যিনি একাই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে বিষয়টি একবারেই তেমন নয়। চলুন এবারের বন্ধু দিবসে জেনে নিই দীর্ঘ সময় রুশ মসনদে থাকা পুতিনের বন্ধু আসলে কারা।
পুতিনের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু। এ দুজন একসময় একসঙ্গে প্রকাশ্যে সাইবেরিয়া গিয়ে শিকার করতেন।
সাবেক সেনা সদস্য শোইগু ২০১২ সালে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়া। এছাড়া সিরিয়া যুদ্ধেও সফল শোইগু।
এ নিয়ে রুশ গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ মার্ক গালেওত্তি বলেন, শোইগু জাতীয় স্বার্থের একজন দৃঢ় রক্ষক। কিন্তু বাকিদের মতো তাঁর মধ্যে পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব নেই।
ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভও পুতিনের ঘনিষ্ঠ একজন। গেরাসিমভ একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা। আর এ জন্যই ইউক্রেন যুদ্ধের ভার পুতিন তাঁর ওপর ন্যস্ত করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৯৯ সালের চেচেন যুদ্ধে সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর থেকেই ভ্যালেরি ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক অভিযানে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পরিকল্পনায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন।
রাশিয়া বিশেষজ্ঞ মার্ক গ্যালিওত্তি তাঁকে রাশভারী, মারকুটে স্বভাবের বলে বর্ণনা করেছেন। জেনারেল গেরাসিমভও ক্রিমিয়া দখলের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
পুতিনের আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলো সিলভোকি। তিনি রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সদস্য ছিলেন। তিনি স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতার বলে গুঞ্জন রয়েছে। পশ্চিমাবিরোধী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি রয়েছে তাঁর।
রুশ প্রেসিডেন্টের আরও দুজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হলেন সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রধান আলেকজান্ডার বোর্টনিকভ এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিন।
বোর্টনিকভ রুশ প্রেসিডেন্টের হয়ে দেশের ভেতরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। বিশেষ করে রুশবিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। নাভালনিকে গ্রেপ্তার ও তাঁর ওপর বিষ প্রয়োগের ঘটনায় বোর্টনিকভের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে পশ্চিমারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়েভজেনি মিনচেনকোর মতে, মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রোসনেফ্টের প্রধান ইগর সেচিনও প্রেসিডেন্টের বেশ ঘনিষ্ঠ।
পুতিনের ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে এক বিরল নারী চরিত্র ভ্যালেন্টিনা মাতভিয়েনকো। রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে বিদেশে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে তাঁর সভাপতিত্বে, আর এর মাধ্যমেই ইউক্রেনে সেনা অভিযানের পথ খুলে গেছে। তিনি ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে দখল করার প্রচেষ্টাতেও সাহায্য করেছিলেন৷
ধনী ব্যবসায়ী দুই ভাই বরিস ও আর্কাডি রোটেনবার্গ প্রেসিডেন্ট পুতিনের শৈশবের বন্ধু ছিলেন। তাঁরাও দীর্ঘকাল ধরে পুতিনের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে আছেন। ২০২০ সালে, ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁদের রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী পরিবার হিসাবে তালিকাভুক্ত করে। ইউরি কোভালচুক হলেন আরেকজন রাশিয়ার ধনকুবের, যাঁর সঙ্গে পুতিনের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
পুতিন যখন লেনিনগ্রাদ বা আধুনিক সেন্ট পিটার্সবার্গের ডেপুটি মেয়র ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে কোভালচুকের পরিচয় হয়। এ নিয়ে অল দ্য ক্রেমলিনস মেন-এর লেখক মিখাইল জাইগার বলেন, কোভালচুক কখনও কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হননি, তবে তিনি স্পষ্টতই রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন এবং তিনি আদর্শগতভাবে পুতিনের খুব কাছাকাছি। পুতিনকে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করা অন্যতম ব্যক্তি তিনি।
চলতি বছরের মার্চে এক রুশ ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাশিয়ার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রসহ যে কোনও শত্রুকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অস্ত্র মস্কোর আছে। এ ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মিত্র ও রুশ নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিকোলাই পাত্রুশেভ। ধারণা করা হয়, ন্যাটো থেকে দূরে রাখতে মন্টেনিগ্রোতে অভ্যুত্থানের পেছনে কলকাঠি নেড়েছিলেন তিনি। এছাড়া পুতিনবিরোধী আলেক্সেই নাভালনিকে গ্রেপ্তারের পর তিনি অভিযোগ করেছিলেন, পশ্চিমারা এ ইস্যুকে সামনে রেখে রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রসহ যে কোনও শত্রুকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অস্ত্র মস্কোর আছে বলে সম্প্রতি হুঁশিয়ার করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মিত্র ও রুশ নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিকোলাই পাত্রুশেভ। তিনি পুতিনের তিন বিশ্বস্ত মানুষের একজন, যারা ১৯৭০ এর দশক থেকে তাঁর সাথে কাজ করেছেন। ওই সময় রাশিয়ার এই দ্বিতীয় শহরটি লেনিনগ্রাদ নামে পরিচিত ছিল।
পুতিনের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে আরেকজন হলেন আন্তন ভাইনো। তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যনির্বাহী অফিসের চিফ অব স্টাফ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে পশ্চিমারা যে কয়েকজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল ভাইনো।



