মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে — এমন ভাবনা থাকলে ইউরোপকে ‘স্বপ্নই দেখতে থাকার’ আহ্বান জানিয়েছেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট।
সোমবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে রুট বলেন, ‘এখানে যদি কেউ আবার মনে করেন যে, আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা পুরো ইউরোপ নিজে নিজে টিকে থাকতে পারবে, তাহলে স্বপ্ন দেখতেই থাকুন। ওটা বাস্তবে সম্ভব নয়। আমরা পারব না। আমাদের একের অন্যকে প্রয়োজন।’
ন্যাটোর প্রধান সতর্ক করে বলেন, ইউরোপ যদি সত্যিই একা চলতে চায়, তাহলে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে, যাতে খরচ হবে কয়েক শ কোটি ইউরো।
রুট বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে আপনারা যেটা হারাবেন সেটা হলো আমাদের স্বাধীনতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ — মার্কিন পারমাণবিক ছাতা। তো…আপনাদের জন্য শুভকামনা রইল!’
রুটের মন্তব্যগুলো এমন সময়ে আসছে, যখন এর আগের সপ্তাহটা ইউরোপের দেশগুলো এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের জন্য ছিল বেশ অস্থির। কারণ? যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের দখল চান! তিনি একদিকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন, আবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, দ্বীপটি দখলে নিতে তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন না।
এই প্রেক্ষাপটেও ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন রুট, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনার জন্য। তাঁর স্বীকারোক্তি, তাঁর এ বক্তব্যে কক্ষে উপস্থিত অনেকেই বিরক্ত হতে পারেন। রুট বলেন, ‘আমি মনে করি তিনি ঠিকই বলেছেন। আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে আসলেই ঝামেলা আছে। এখানে প্রশ্নটা যৌথ নিরাপত্তার, কারণ ওখানে সমুদ্রে (বরফ গলে) নতুন পথ তৈরি হচ্ছে এবং চীন ও রাশিয়া সেখানে আরও বেশি করে সক্রিয় হচ্ছে।’
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সামনে দুটি পথে কাজ হবে বলে জানান ন্যাটো মহাসচিব। প্রথমত, আর্কটিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ন্যাটো আরও সমষ্টিগতভাবে নেবে, যাতে রাশিয়া ও চীন সেখানে সামরিক বা অর্থনৈতিক – কোনো দিক থেকেই প্রভাব বাড়াতে না পারে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা চলবে। তবে রুট স্পষ্ট করে বলেন, তিনি এই আলোচনায় জড়িত থাকবেন না। কারণ, ডেনমার্কের পক্ষে আলোচনার কোনো ম্যান্ডেট তাঁর নেই, এবং তিনি সে দায়িত্ব নেবেনও না।
এ মাসের শুরুতে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোট্জফেল্ড ওয়াশিংটনে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকটিকে ‘গঠনমূলক’ বললেও রাসমুসেন জানান, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে এখনো ‘মৌলিক কিছু ব্যাপারে মতপার্থক্য’ রয়ে গেছে।
এর পরের সপ্তাহে দাভোসে ট্রাম্প ও রুটের বৈঠক হয়। সেখানে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে তিনি একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এর ফল হিসেবে তাঁর গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনার বিরোধিতা করা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণাও তিনি ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে জানান ট্রাম্প।
তবে ট্রাম্প ও রুটের বৈঠকে যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, ওই কাঠামোর ভেতরে ঠিক কী আছে, কিংবা আলোচনায় রুটের প্রকৃত ভূমিকা কী — তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্পের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে ফেলেছে ন্যাটোর মহাসচিবকে।



