‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘আজ রবিবার’—এমন অসংখ্য নাটকে স্মরণীয় হুমায়ূন আহমেদ। ঘুরেফিরেই আসে তাঁর কথা। বলা যায়—হুমায়ূন আহমেদ দৈহিকভাবে না থেকেও আছেন এই সময়ে। শতশত নাটক, সিনেমা ও গল্প-উপন্যাসজুড়ে আজও জীবন্ত তিনি।
বিশেষ করে টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে এখনও হুমায়ূন আহমেদ অতুলনীয়। তাঁর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেননি কোনো নির্মাতা। কিন্তু কেন?
আজ (১৩ নভেম্বর) এই নন্দিত লেখক-নির্মাতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালে কথা বললেন অভিনেতা ফারুক আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আসলে পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ জন্মায় কালোত্তীর্ণ, হুমায়ূন আহমেদ তেমনই একজন মানুষ, লেখক ও পরিচালক। আলাদা একজন সত্তা। এই রকম মানুষ যুগে যুগে একজনই আসেন।’
হুমায়ূন আহমেদের ‘হাবলঙ্গের বাজারে’, ‘তারা তিনজন’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, ‘মহান চৈনিক চিকিৎসক ওয়াংপি’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন ফারুক আহমেদ। বর্তমান সময়েও টেলিভিশন নাটকে সরব তিনি। তাই তাঁর কাছে নাটকের একাল-সেকাল দুটোই দেখা। জনপ্রিয়তায় হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘তাঁর জানার ভাণ্ডার ছিল অনেক বেশি। অনেক পড়াশোনা করতেন। অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা করেছেন, যে কারণে উনার বুদ্ধিমত্তা অনেক বেশি ছিল। বলা যায়, সীমাহীন। অনেকেই তাঁর লেখায় গভীরতা নেই বলতে চেষ্টা করেন। আসলে তাঁকে অনেকে বুঝেনই না। আমি সবসময় একটা উদাহরণ দিই—ভৃত্য এবং চাকর, এই দুটি শব্দই তিনি জানতেন। কিন্তু যেন সবাই বুঝতে পারেন, তাই ‘চাকর’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। অনেকে ভাবেন তিনি বোধহয় ‘ভৃত্য’ শব্দটি জানেন না, শুধু চাকরটিই জানেন! কোনো কোনো বোদ্ধার মতে, যদি কঠিন করে লেখা যায়, সবাই না বুঝেন, তবেই সেই লেখা কালোত্তীর্ণ; গভীরতা অনেক বেশি! কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের লেখা কিংবা নাটক-সিনেমা যিনি ঠিকমতো লক্ষ্য করবেন, সে-ই বুঝতে পারবেন তিনি কী বলতে চেয়েছেন। যে নব্বই দশকে আমরা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, যখন প্রকাশ্যে রাজাকার বলা যেত না, তখন তিনি পাখির মুখ দিয়ে নাটকের পর্দায় কী সুন্দর করে ‘তুই রাজাকার’ কথাটি নিয়ে এসেছিলেন। এবং এটি সার্বজনীন হয়েছিল। আমার কাছে মনে হয়, সাহিত্যে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। চিন্তায় ছিলেন সবার থেকে আলাদা। যে কারণে তিনি এত জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।’

টেলিভিশন নাটকে যখন দর্শক খরা, তখনও কথা প্রসঙ্গে চলে আসে হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ। তাঁর ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি দর্শকের মুখে মুখে। ফারুক আহমেদ বললেন, ‘‘লেখনী অথবা নাটক দিয়ে মানুষের খুব কাছে চলে যেতেন হুমায়ূন আহমেদ। খুব সাবলীলভাবে নাটক নির্মাণ করতেন। ‘কোথাও কেউ নেই’ দেখে দর্শকরা কতটা ভেতরে ঢুকে যায়, মনে হয় যেন এটাই বাস্তব। যে কারণে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে মানুষজন মিছিল করেন। এমন তো এখন কল্পনাও করা যায় না, কারণ তাঁদের মনে হচ্ছিল নাটকের গল্পটাই বাস্তব। এই জন্যই আমাদের মনে হয় যে, তাঁর মতো লেখক-নির্মাতা এখনও আসেননি। যে কারণে নাটক-সাহিত্যে একজন হুমায়ূন আহমেদের অভাববোধ করি আমরা, তাঁকে মিস করি সব সময়।’’

হুমায়ূন আহমেদের রচনা কিংবা পরিচালনায় ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আজ রবিবার’, ‘নক্ষত্রের রাত’ প্রভৃতি কালজয়ী নাটকে অভিনয় করেছেন অভিনেতা আবুল হায়াত। তিনি বললেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত উঁচু মানের একজন নাট্যকার ও গল্পকার। তাঁর সংলাপ খুব সহজেই দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে যেত। চমৎকার করে গল্প বলতে পারতেন। দর্শক মুগ্ধ হয়ে সেই গল্প দেখতেন। শিল্পীরাও মুগ্ধ হয়ে অভিনয় করতেন। আমি তাঁকে সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার হিসেবেই বেশি এগিয়ে রাখবো।’

হুমায়ূন আহমেদের নাটক-চলচ্চিত্রে শুধু অভিনয়ই নয়, খুব কাছ থেকে এই নন্দিত নির্মাতাকে দেখেছেন অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ। জনপ্রিয়তা কেন হুমায়ূন আহমেদই সেরা—এ বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘তিনি (হুমায়ূন আহমেদ) যেভাবে কাজ করতেন যেভাবে লিখতেন বা নির্দেশনা দিতেন, সেভাবে আগে কেউ করেনি এতটুকু বলতে চাই। আমি কাজের শুরুতেই বরাবরই বলতাম, স্যার, আপনি একটু আমাকে দেখিয়ে দেন। তিনি যেভাবে আমাকে দেখিয়ে দিতেন, সেভাবে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা করতেও পারিনি। কারণ তিনি প্রতিটা বিষয়, প্রতিটা অভিনয় এত গভীরভাবে দেখিয়ে দিতেন যে সেটা একজন অভিনেতার পক্ষে করা কঠিন। কারণ তিনি যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো দেখতেন, সেই গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো দেখা আমাদের মতো অভিনেতাদের জন্য খুবই কঠিন।’
পরিশেষে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ একজনই। যে তাঁর সৃষ্টিকর্মে সমাজ বাস্তবতা ও দেশের মানুষকে সামগ্রিকভাবে ধরতে পেরেছিলেন।


আমি হুমায়ূন আহমেদ হতে চাই...
ঢাকায় আসছেন মাজিদ মাজিদি
