
‘গ্যাংস্টার’ শব্দটি শুনলেই যে কারও মনের ভেতর ছায়ার মতো ঘুরপাক খায় একটি অবয়ব। বাস্তবে না দেখেও যাঁর দুর্ধর্ষ কর্মকাণ্ড ভেসে ওঠে চোখের গভীরে। খুনখারাপি, চাঁদাবাজি, রাহাজানি—এমন জঘন্য সব অপরাধ যাঁর অস্থিমজ্জায়। আশির দশকে ভারতের হুগলিতে তেমনই এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল হুব্বা শ্যামল। সবাই তাকে ‘হুগলির দাউদ ইব্রাহিম’ বলেই চিনত। এবার সেই কুখ্যাত গ্যাংস্টারকে পর্দায় তুলে আনলেন পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা ও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। এতে নাম ভূমিকায় রয়েছেন বাংলাদেশি অভিনেতা মোশাররফ করিম। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারি) এপার-ওপার দুই বাংলাতেই একযোগে মুক্তি পেয়েছে ছবিটি।
ট্রেলার প্রকাশের পরই সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল। মারকাটারি অ্যাকশন আর সংলাপে দর্শকদের মধ্যে তা দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বেশ। অবশেষে পর্দায় কি পরিচালক পেরেছেন দর্শকের সেই বিপুল প্রত্যাশা পূরণ করতে? মোশাররফ কি পেরেছেন তাঁর খেলা দেখাতে? প্রিমিয়ারে ছবিটি দেখার পর মনে হলো, হ্যাঁ, গ্যাংস্টার হুব্বার ভূমিকায় মোশাররফ সফলই হয়েছেন। তবে গল্পটা খানিকটা একমুখী, হুব্বার কর্মকাণ্ডে ঠাসা। অন্যান্য চরিত্রগুলো সেখানে এতটাই কোণঠাসা, যে পুরো গল্পের প্রবাহ হয়ে গেছে একপাক্ষিক ও একপেশে।

পর্দায় মোশাররফ করিম তথা হুব্বাকে অনেকগুলো লুকে দেখা যায়। হাবভাব, কথাবার্তা আর চালচলন তার পাগলাটে। কখন কী করে বসেন, সেটা কেবল সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন!
ছবিটি নির্মাণের বিষয়ে পরিচালক জানিয়েছিলেন, সুপ্রতিম সরকারের লেখা একটি উপন্যাস অবলম্বনে এটি নির্মিত হয়েছে। ফিকশনধর্মী বায়োপিক। হুব্বাকে আমরা যাঁরা কখনও দেখিনি, তাঁদের কাছে এই ছবিই তার প্রতিচ্ছবি! এদিকে, মোশাররফ করিম বলেছিলেন, ‘গল্পটি যেভাবে সিনেমাটিতে বলা হয়েছে, তা দর্শককে নিরাশ করবে না।’ কথা সত্য! যেহেতু এটি বায়োপিক, গল্প তাই ‘হুব্বা বিমলের’ ছোট থেকে বড়বেলার দিকেই সরলরৈখিকভাবে ধাবিত হতে পারত! কিন্তু তাহলে সেটি আর দশটি সিনেমার মতোই হতো! ব্রাত্য বসু গল্পটি বলার চেষ্টা করেছেন অন্য প্যাটার্নে, যা এই সিনেমার আকর্ষণীয় দিক। গল্পে ওঠা-নামা ছিল—কখনও হুব্বা ফিরে যাচ্ছে তার শৈশবে, আবার কখনও কৈশোরে! গল্প বলার ক্ষেত্রে একদিকে তা যেমন চিত্তাকর্ষক, আবার এর দুর্বল দিকও রয়েছে। সাধারণ দর্শক এতে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন। কারণ এক সময় থেকে আরেক সময়ে যাওয়ার যে যাত্রা, তা কখনোই মসৃণ ছিল না।
তবে অভিনয়ে মোশাররফ করিমের রংবাজি ছিল ‘হুগলির হুব্বা’র মতোই! রাগ-প্রতিহিংসা অথবা হাসি-অট্টহাসি তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল। বাংলাদেশি অভিনেতাকে এমন একটি গ্যাংস্টার চরিত্রে দেখতে পাওয়া দর্শকের জন্য যেমন সৌভাগ্যের, অভিনেতা নিজেও তেমনি সৌভাগ্যবান। কেননা, বিগত কয়েক দশকে এমন গ্যাংস্টার চরিত্রে দুই বাংলায় মোশাররফ করিমের মাপের কোনো অভিনয়শিল্পীকে এতটা প্রবলভাবে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে রেদওয়ান রনির ‘চোরাবালি’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন তখন তিনি। এবারও এ দেশের দর্শকের সুযোগ হয়েছে তাঁকে দেখার। হুব্বায় তিনি রয়েছেন সিআইডি অফিসার দিবাকরের ভূমিকায়। এই চরিত্রের জন্য তাঁকে বেছে নেওয়া দারুণ হয়েছে। অভিনেত্রী পৌলমী বসুও ছিলেন অন্য এক আমেজে। এমন ওজনদার অভিনয়শিল্পীদের ভিড়ে যিনি আলাদাভাবে নজর কাড়েন, তিনি গম্ভীরা ভট্টাচার্য। যুবক হুব্বার ভূমিকায় তাঁর অভিনয় মন জুড়ানো। একে মূল চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, তার ওপর মোশাররফের কথা বলার ভঙ্গিও হয়তো তাঁকে আয়ত্ত করতে হয়েছে—যা খুবই চ্যালেঞ্জিং এক বিষয়। ‘যুবক হুব্বা’ হিসেবে তাঁর অভিনয় সত্যিই মুগ্ধতা এনে দেয়।

এই ছবির সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন সৌমিক হালদার। তাঁর মুনশিয়ানা ছিল বেশ। তবে দু-একটি শট দর্শকদের কিছুটা দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। মনে হয়—সৃষ্টিশীলতা আনতে গিয়ে কোথায় যেন পরিপূর্ণতা পেল না সেগুলো!
এদিকে, ছবিটির আবহসংগীত দর্শকের মনে প্রভাব বিস্তার করে নিশ্চিতভাবেই। সেটি সু নাকি কু—তা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে অনেকটা। পাড়া-মহল্লায় পূজা-পার্বণে ধুম-ধারাক্কা গান বাজালে অনেকের যেমন কানে লাগে, আবার অনেকের ভালোও লাগে; সংগীতায়োজনে ঠিক তেমনই একটা আবহ ছিল। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি। আর গানে শিলাজিৎ ছিলেন তাঁর মতোই মৌলিক। অদ্ভুত লিরিকে, অদ্ভুত এক ঘোরলাগা সৃষ্টি করতে পেরেছেন তিনি।

‘হুব্বা’ বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি। মারামারি-কাটাকাটি-প্রেম-মাদক কিংবা দুষ্টু গান—মশলাদার সব উপাদানই রয়েছে এতে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তা দর্শনীয়; ১৮ বছরের কম বয়সীদের নাগালের বাইরে রাখাই ভালো। আরও ভালো হতো, শুরুতেই এই ডিসক্লেইমার (১৮+) দিয়ে দেওয়া হলে।
পরিশেষে, গ্যাংস্টার কিংবা গডফাদারধর্মী সিনেমা যাঁরা পছন্দ করেন, অনায়াসে তাঁরা এই ছবি দেখতেই পারেন। ইউরোপ-আমেরিকার মতো এই ভারতীয় ভূখণ্ডের গ্যাংস্টারদের আচরণও একই, শুধু সংস্কৃতিগত জীবনাচরণের একটা পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হবে। তবে সেটিকে ‘দারুণ’ বলা যাবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবেই তর্কসাপেক্ষ। কারণ হুব্বা দেখে কিছুটা এলোমেলো মনে হওয়ার আশঙ্কাও আছে। হয়তো চিত্রনাট্যের ওপর আরেকটু বেশি মনযোগ দিলেই সেই ঘাটতি মিটে যেত একেবারেই!



