অনেক শিশু ছোটবেলায় অনেক চুপচাপ থাকে। তারা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইনের গেমসে ডুবে থাকে। এসব শিশুরা বিষণ্নতায় ভোগে বেশি। দেশের কজন বাবা-মা খেয়াল করেন, তাদের সন্তান বিষণ্নতায় ভুগছে কিনা? তাই ‘প্যারেন্টিং’ শেখা দরকার। আমরা যদি হাঁস–মুরগি কীভাবে পালতে হয় সেটা শিখতে পারি, তাহলে প্যারেন্টিং কেন নয়!
আরেকটা প্রশ্ন আসতে পারে, বাবা-মার মধ্যে দ্বন্দ্ব কি থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। দুটো মানুষের মধ্যে তর্ক–বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু এই ব্যাকরণটি জানা প্রয়োজন, সেটা আমরা কীভাবে প্রকাশ করব। খেয়াল রাখতে হবে নিজেদের দ্বন্দ্ব যেন সন্তানের মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে।
যেসব পরিবারে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, সেসব পরিবারের বাবা–মা নিজেদের হতাশা-ক্ষোভ দুঃখ সন্তানের সামনে প্রকাশ করেন। এতে সন্তানের মধ্যে তীব্র কষ্ট তৈরি হয়। কিন্তু তার কষ্টের কথা কারও কাছে প্রকাশের জায়গা পায় না। বাবা-মা সন্তানকে ব্যবহার করেন অপরজনকে ঘায়েল করার জন্য। এ ছাড়া অনেক বাবা–মা আছেন যারা শুধুমাত্র সামাজিক কারণে একসঙ্গে থাকছেন। কারণ সামাজিক একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে, ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা নাকি নষ্ট হয়ে যায়।
অথচ এই সংসারগুলোতে বাবা-মা ক্রমাগত দোষ দিতে থাকেন একমাত্র সন্তানের খাতিরে তারা একসঙ্গে আছেন।
একবার ভাবুন তো! অষ্টপ্রহর যদি আপনাকে দোষের ভাগীদার করা হয় আপনার কেমন লাগবে? আপনারা সংসার করতে পারছেন না, সেটা আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। সেখানে সন্তানকে টানছেন কেন? সংসার টিকিয়ে রাখতে সন্তানের দোহাই দেওয়া ভয়ংকর বিষয়।
শিশুরা অনেক বুদ্ধিমান। তারা প্রচণ্ডভাবে বাবা-মাকে খেয়াল করে। কাজেই পুথিগত নীতিবোধ, মূল্যবোধ এসব বুলি কপচিয়ে কোন লাভ নাই। একটা প্রবাদ আছে , 'পুঁথিগত বিদ্যা আর পর হস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন!' বাবা–মা নিজেদের জীবনে যে আচরণগুলো করেন, শিশুরা ঠিক সেটাই শিখবে। আমি বক্তৃতায় অনেক ভালো কথা বলে বাসায় গিয়ে যদি গৃহকর্মীকে থাপ্পড় দেয় সন্তান কিন্তু সেটাই শিখবে।
গবেষণা বলছে, মানুষের মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ ২৫ বছর পর্যন্ত উন্নতি লাভ করে। এই স্নায়ুকোষ দ্বারা বাবা-মায়ের আচরণ সন্তান নিজের অজান্তেই অনুকরণ করে। যার ব্যাপ্তিকাল সন্তানের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। কাজেই আমাদের সাবধান হতে হবে, নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? কারণ ভবিষ্যতেও তারা অবচেতন মনে অনুকরণ করবে। শুধু কি একজন সন্তান ভুগবে? না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই আচরণ অবচেতনভাবে অনুকরণ হতে থাকবে। শুধু তাই নয় আরও গভীরে ঢুকলে দেখা যাবে, এর সঙ্গে বংশপরম্পরায় জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাবও বিদ্যমান। অর্থাৎ এই অনুকরণের অনুরণন মনোদৈহিক।
কাজেই বাবা– মায়ের কাছে অনুরোধ, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বন্ধ করুন। সন্তানকে তুমি এটা পারো না, সেটা পারো না, কিন্তু অমুকের সন্তান এটা পারে, সেটা পারে বলে নিন্দা কোর আগে একবার একটু নিজের চোখে সামনে আয়নাটা ধরুন।
নিজের চোখে আয়না ধরাটা একটি নিয়মিত চর্চার ব্যাপার। এটা একদিনে আয়ত্ত হবে না। সাধে তো আর সক্রেটিস বলেন নি, ‘know thyself!’ বা ‘নিজেকে জানো’। আমার স্বল্পজ্ঞানে মনে হয় নিজেকে জানার থেকেও কথাটি সম্ভবত নিজেকে চেনা! কারণ আমরা অন্যকে চিনতে যত বেশি সময়ে বা মনোযোগ ব্যয় করি, নিজেকে চিনতে মোটেও সেটা করি না। নিজের ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা, সীমাবদ্ধতাটুকু বোঝবার জন্য চোখে আয়না ধরা মানুষের ভীষণ প্রয়োজন। 'আদর্শ আমি' আর 'সত্যিকারের আমি' এর মধ্যে ফাঁক থাকবে, অথচ আশা করব সন্তান আদর্শ হবে! তাহলে তো বোকার স্বর্গে বাস। তাই না?
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ



