এ বছর জাতীয় শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ধরে আনব হাসি সবার ঘরে’। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। তারা যা দেখে, তাই করার চেষ্টা করে। তাই সুন্দর আগামীর জন্য শিশুদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী দরকার।
শিশু মানে শুধু সুস্থ শিশু নয়। শিশু মানে অসুস্থ শিশুও, যে আর ভালো হবে না। অথবা যে শিশু বিছানায় পড়ে থাকে, বাক, দৃষ্টি বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। আজকের এই শিশুদিবসে ভিন্ন চাহিদাসম্পন্ন সেই শিশুটিরও দিবস। যে সমাজের মূল স্রোতের শিশুদের সঙ্গে একই স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। এক কথায় বাংলাদেশের প্রত্যেকটি শিশুর জন্য আজ শিশু দিবস।
কোনোদিন চিকিৎসক বেদনার্ত মুখে হয়তো বলে দেন, ‘এই শিশুটি আর কখনো ভালো হবে না। আর কিছু করার নেই বাড়ি নিয়ে যান।’ এ কথা শোনার পর শিশুর বাবা উৎকণ্ঠিত গলায় হয়তো জিজ্ঞেন করেন, ‘যদি দেশের বাইরে নিয়ে যাই? সেখানে কি কোন চিকিৎসা নেই?’ চিকিৎসক বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সন্তান হলেও প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই রোগ ভালো হওয়ার নয়।’ কান্না বিজড়িত কণ্ঠে মা জানতে চাইবেন হয়তো, ‘এরপর কি হবে?’ চিকিৎসক উত্তর দিতে পারেন, ‘ধীরে ধীরে অবস্থা আরো খারাপ হবে।’
এমন নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত শিশুকে বাসায় আনার পরে বাবা-মা কি করবেন?
প্যালিয়েটিভ কেয়ার কি?
নিরাময় অযোগ্য, জীবন সীমিত রোগে আক্রান্ত একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ যত্নই প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবা। শুধু তাই নয়, রোগীর পাশাপাশি রোগীর সেবা প্রদানকারী পরিবারের যত্নের কথাও চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই শাখাটি বলে থাকে। যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি বলে—আর কিছু করার নেই বাড়ি নিয়ে যান, সেখানে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বলে এখনো রোগী এবং তার পরিবারের ভোগান্তি কমানোর জন্য অনেক কিছু করার আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস আধানোম বলেছিলেন, 'Palliative Care is the best kept secret in medical science'।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত শিশুদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সংজ্ঞা হলো–
১. শিশুদের প্যালিয়েটিভ কেয়ার একটি বিশেষ ক্ষেত্র, যা অনেকটা বড়দের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মতই।
২. প্যালিয়েটিভ কেয়ার হচ্ছে শিশুর শরীর, মন ও আত্মার জন্য একটি সক্রিয় সামগ্রিক সেবা এবং একই সাথে শিশুর পরিবারকে সহায়তা প্রদান করাও এই সেবার অন্তর্ভুক্ত।
৩. সেবা প্রদানকারীকে অবশ্যই শিশুর শারীরিক মানসিক ও সামাজিক কষ্টগুলোর মূল্যায়ন করা শিখতে হবে এবং তা উপশমের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. একটি কার্যকর প্যালিয়েটিভ সেবার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে থাকবে পরিবার এবং সমাজের সহজলভ্য সম্পদের যথার্থ ব্যবহার।
৫. সম্পদের অপ্রতুলতা থাকলেও এই সেবার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।
৬. বিশেষায়িত হাসপাতাল, কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, এমনকি শিশুর বাড়িতেও এই সেবা দেওয়া সম্ভব।
আমরা এমন একটি সমাজে থাকি, যেখানে শিশুকে নিয়ে মনে করি দামি খাবার, দামি কাপড়, দামি স্কুল আর মাঝে মাঝে বিদেশে বেড়াতে নিয়ে গেলেই সব হয়ে যায়। অথচ একটি শিশু, যে তার মনের অনুভূতি প্রকাশ্যে অক্ষম তার কথা আমরা ঠিকমতো শুনতে চাই না। আমরাই তাকে কথা বলার সুযোগ দেই না। ভেবে থাকি, ‘ও বাচ্চা, ও কি আর বুঝবে?’ অথচ শিশুটি বড় হলেই আশা করি, সে প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের মতামত দেবে। ছোটবেলা থেকে যদি শিশুর মতকে আমরা সম্মান না করি, সে শিশু বড় হলে কীভাবে মতামত দেবে? এটা তো একটি চর্চার ব্যাপার। সেই ক্ষেত্রে যে শিশুটি নিরাময় অযোগ্য রোগে ভুগছে, তার মতের আমরা আসলে কি কোন ধার ধারি?
প্রতি বছর জাতীয় শিশু দিবস আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু এই নিরাময় অযোগ্য জীবন সীমিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের কি আমরা এই শিশু দিবসে মনে রাখি? যদি মনে রাখি, তাহলে আজকে এবং আগামীর দিনে এদের এবং এদের পরিবারের ভোগান্তি কমাতে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছি? কারণ এ রকম একটি নিরাময়ে অযোগ্য শিশু আজ এবং আগামীতে যেকোনো সময় আপনার, আমার, যে কারো পরিবারেই আসতে পারে। তাই না?
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাক্টিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ


প্যারেন্টিং সম্পর্কে যা জানা প্রয়োজন
শিশুর ডায়রিয়া কেন হয়? যা করবেন
