মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের তৈরি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটির অভিযোগ আমলে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তার আগে পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তেমন কিছুই করার নেই।
কারিগরি ত্রুটির কারণে সারা বিশ্বে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে থাকা মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের তৈরি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলের উড়োজাহাজগুলো গ্রাউন্ডেড করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির একজন সাবেক প্রকৌশলী।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৌশলী স্যাম সালেহপর দাবি করেছেন, উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে উড়োজাহাজগুলোর অনেকগুলো ক্রটিকে পাত্তা দেওয়া হয়নি।
স্যাম সালেহপর বলছেন, বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে থাকা বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজগুলো নিরাপত্তা পরীক্ষণের জন্য গ্রাউন্ডেড করা উচিত।
সালেহপর মার্কিন টেলিভিশন এনবিসিকে বলেছেন, ‘আমি যতটুকু জানি, ড্রিমলাইনারের পুরো বহরের দিকে এখন নজর দেওয়া উচিত।’
অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বোয়িং।
ড্রিমলাইনার নিয়ে অবশ্য এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার বিড়ম্বনায় পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ বছরের শুরুতে প্রায় ৩০০ যাত্রী নিয়ে দাম্মামের পথে ঢাকা থেকে ওড়ার ২ ঘন্টা পর একটি ড্রিমলাইনারের উইন্ডশিল্ড ফেটে যায়। পরে যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে মাঝ আকাশ থেকেই দেশে ফিরিয়ে আনা হয় উড়োজাহাজটি। আগেও দুবার একই এমন বিপত্তি দেখা গেছে।
২০০৩ সালে বোয়িং জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০০৪ সালের ২৬ এপ্রিল প্রকল্পটি শুরু হয়। এ সময় জাপানের অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ ৫০টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই ৭৮৭ মডেলের প্রথম উড়োজাহাজটি প্রস্তুত হয়। মডেলটি প্রথম ফ্লাইট ছিল ২০০৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর। তবে প্রথম ড্রিমলাইনার মডেলটি সরবরাহ করা হয় ২০১১ সালে। আর এটির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় একই বছরের ২৬ অক্টোবর থেকে।
বর্তমানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে এক হাজারের বেশি ড্রিমলাইনার মডেলের উড়োজাহাজ রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানের কাছেও এই মডেলের ৬টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এগুলো দিয়ে বিমান মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও কানাডায় ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।
দেশের এভিয়েশন বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন অভিযোগের তদন্ত যত তাড়াতাড়ি হবে ততই মঙ্গল।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘মানুষের মনে কিছুটা হলেও তো শঙ্কা তৈরি হতে পারে, এটা দ্রুতই দুর করে ফেলা উচিত। যেহতু আমাদের এখানে বিমানের বহরে এটা বড় অংশই কিন্তু ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। অভিযোগ যে সঠিক নয় এটা এখন বোয়িংকে প্রমান করতে হবে।’
তবে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া বাংলাদেশ বিমানের তেমন কিছুই করার নেই, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, বিপদের ঝুঁকি কম থাকলেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যদি সত্যিই এমন কিছু থাকে তাহলে ওরা একটা এয়ারওর্দিনেস ক্লারিটি ইস্যু করবে। সেখানে বলা থাকবে, এটার জন্য তোমরা এই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করো। পুরো বিশ্বেই যে ড্রিমলাইনারগুলো আছে সবার ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য হবে। তবে আমার মনে হয় আমরা যতটা ভাবছি এতটা হয়ত হবে না।’
অতীতে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজে ত্রুটির অভিযোগ তদন্তের মধ্যেই অভিযোগকারীর রহস্যজনক মৃত্যুর নজির রয়েছে।
বিমানের আধুনিকায়নে ২০০৮ সালে বোয়িংকে ১০টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয় বিমান। এর মধ্যে ৪টি ছিল ড্রিমলাইনার। ২০১৮ সালে বিমান প্রথম ড্রিমলাইন বুঝে পায়। আর চতুর্থটি যুক্ত হয় পরের বছর সেপ্টেম্বরে। এরপর বিমান আরও দুটি ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ কিনেছে।
শুধু ড্রিমলাইনারই নয়, ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ নিয়েও সংকটে আছে বোয়িং। গত প্রায় ৫ বছর ধরেই এই মডেলের উড়োজাহাজগুলো নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দুটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ৩৪৬ জন মারা যান। সম্প্রতি একই মডেলের একটি উড়োজাহাজের দরজায় বিস্ফোরণের ঘটনা হয়।
এই ঘটনাগুলোর কারণে এই মডেলের অনেকগুলো উড়োজাহাজকে গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। এতে বোয়িংয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে গেছেন প্রধান নির্বাহী ডেভ কালাহন।
ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজগুলো গ্রাউন্ডেড করার কারণে গত তিন মাসে প্রায় ২০ লাখ ডলার ক্ষতির কথা জানিয়েছে মার্কিন বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারলাইনস।


বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনার গ্রাউন্ডেড করার পরামর্শ সাবেক প্রকৌশলীর
ড্রিমলাইনারে ক্রটির অভিযোগ, যা বলছে বেবিচক
