একদিকে অন্ধকার অরণ্য। তাতে নিশুতি রাতে উঁকি দেয় রহস্য। মানুষের প্রাণও যায়। সেই মৃত্যু আবার পোকামাকড়ের জালে ঘেরা। অন্যদিকে একচোখে দেখা, আরেক চোখে না দেখা এক পুলিশ ইন্সপেক্টর দিনে–দুপুরে দেখেন প্রেমিকার অশরীরী আত্মা! এভাবেই গল্পের সূচনা ঘটে।
বলা হচ্ছে ‘ইন্সপেক্টর ঋষি’ নিয়ে। ভারতের তামিল ভাষার এই ওয়েব সিরিজটি গত মাসের একদম শেষের দিকে মুক্তি পায় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্রাইম ভিডিওতে। হিন্দি, মালায়লমসহ বেশ কিছু ভাষায় ডাব করেও মুক্তি পেয়েছে সিরিজটি। এর প্রতি দর্শকদের আগ্রহ খুবই। বিশেষ করে দর্শকদের ওয়ার্ড অব মাউথে সিরিজটি খ্যাতি পেয়েছে ভালোই।
‘ইন্সপেক্টর ঋষি’ মূলত হরর, সাসপেন্স ঘরানার। এতে ভয় আছে, রহস্য আছে, আছে অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ও। সব মিলিয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট হিসেবে একেবারে নিখুঁত। আর এমন নিখুঁত বানানোর পুরস্কারও পেয়েছে সিরিজটি। আইএমডিবিতে ১০–এর মধ্যে সাতের বেশি রেটিং পেয়েছে সিরিজটি।
তামিল ভাষার এই সিরিজটির প্রধান চরিত্রটির নামই ঋষি। সে পেশায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঘটে যাওয়া একটি রহস্যময় মৃত্যু নিয়েই কাহিনির শুরু। এরপর মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে। তার সঙ্গে আবার যুক্ত হয় বনরক্ষীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ভীতি। সেই ভীতির উৎসটি হলো ‘বনরাচি’। এই নামের এক অপদেবতা সংক্রান্ত ভীতিই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। আর মৃত্যুর ধরনগুলো এতটাই রহস্যে মোড়ানো, যে সেগুলোর পেছনে দায়ী হিসেবে কোনো মানুষকে দাঁড় করানো শুরুতে সম্ভব হচ্ছিল না। তবে ইন্সপেক্টর ঋষি অতিপ্রাকৃত ঘটনায় বিশ্বাসী ছিল না। যদিও প্রায় সময়ই নিজের প্রাক্তন প্রেমিকার অশরীরীকে চোখের সামনে দেখতে পেত সে। এসব রহস্যে মোড়ানো মৃত্যুর যৌক্তিক সমাধান খুঁজতেই দিন–রাত এক করে ফেলে ঋষি। সাথে থাকে দুজন সাব ইন্সপেক্টর এবং কয়েকজন বনরক্ষী। এভাবে তদন্ত চালাতে চালাতে এক অদ্ভুত সত্য উন্মোচিত হয় ঋষির সামনে। সেই সাথে ফের উঁকি দেয় বনরাচিও।
পুরো সিরিজে মোট ১০টি পর্ব আছে। একেকটি পর্বের ভিন্ন ভিন্ন নাম। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিটি পর্বই দুর্দান্তভাবে শুরু এবং শেষ হয়েছে। ফলে পরবর্তী পর্ব দেখার আগ্রহ একেবারেই মরে না। বরং টানা দেখে ফেলতে ইচ্ছে করে সবগুলো পর্ব। পুরো সিরিজের চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে নিখুঁত। কোনো বাড়াবাড়ি নেই একেবারেই। সেই সাথে সিনেমাটোগ্রাফিও ছিল দারুণ। লাইট ও শ্যাডো এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে অভিভূত হতেই হয়। বনের সৌন্দর্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বেশ ভালোভাবে। ফলে চোখে আরাম পাওয়া যায়। এছাড়া সিরিজে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের ব্যবহারও দুর্দান্ত ছিল।
সবচেয়ে মোহনীয় জিনিসটি হলো, সিরিজের অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়। কারও অভিনয়েই ন্যূনতম মেদ ছিল না। অভিনয়ে বাড়াবাড়ি যেমন দেখা যায়নি, তেমনি অভিব্যক্তির কমতিও চোখে পড়েনি। এতটা মাপা অভিনয় সত্যিই অতুলনীয়। মূল চরিত্র ঋষির ভূমিকায় ছিলেন নবীন চন্দ্র। পর্দায় তাঁর দুই সহযোগী সাব ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় ছিলেন যথাক্রমে কন্না রবি ও মালিনী জীবারত্নম। এছাড়া বন কর্মকর্তার চরিত্রে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ দয়াল। এই চরিত্রটিতে ছিল বিচিত্র শেড, তার সবকটিতেই মানিয়ে গেছেন দয়াল। আর বনরক্ষী ক্যাথির ভূমিকায় থাকা সুনয়নার প্রচেষ্টার প্রশংসা করতেই হয়।
সব মিলিয়ে ‘ইন্সপেক্টর ঋষি’ না দেখলে সত্যিই একটি ভালো কনটেন্ট থেকে বঞ্চিত হতে হবে। বিশেষ করে রোমান্টিক দৃশ্য থেকে যেভাবে রহস্যের দিকে ফের ঘুরে গেছে দৃশ্যপট, কিংবা এর উল্টোটাও হয়েছে মাঝে মাঝে—এই যে রূপান্তর প্রক্রিয়া, সেটি এতটাই মসৃণভাবে হয়েছে যে পরিচালক নন্দিনী জেএস’কে কৃতিত্ব দিতেই হয়। পুরো সিরিজটাই যে ঠাস বুনোটে তৈরি, সেটির প্রশংসাও আসলে পরিচালকের ভাগেই যায়।
তাহলে আর দেরি কেন? দেখে ফেলুন ‘ইন্সপেক্টর ঋষি’। সময় ও সাবস্ক্রিপশন ফি—কোনটাই গচ্চা যাবে না, সেটি নিশ্চিত।
রেটিং: ৪.৫/৫
পরিচালক: নন্দিনী জেএস
গল্প ও চিত্রনাট্য: নন্দিনী জেএস
অভিনয়শিল্পী: নবীন চন্দ্র, কন্না রবি, মালিনী জীবারত্নম, শ্রীকৃষ্ণ দয়াল প্রমুখ
ভাষা: তামিল
ধরন: হরর, সাসপেন্স
পর্ব: ১০
মুক্তি: ২৯ মার্চ, ২০২৪/প্রাইম ভিডিও
লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক



