কূটনীতি হচ্ছে এমন একটি বিষয় যাকে অবলম্বন করে একটি দেশ অন্য দেশ, তথা একাধিক দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, সে সম্পর্ক চিরস্থায়ী করে এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতি সাধন করে। আর এই কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পাদনের জন্য দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে আলোচনা পর্যালোচনা চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম বাহন হচ্ছে কূটনীতি। এটি এমন একটি মাধ্যম যা দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা দূর করে ক্রমান্বয়ে উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হয়। ভবিষ্যতে দু দেশের মধ্যে কোন মতপার্থক্য সৃষ্টি হলে তা নিরসন করা সহজ হয়, পারস্পারিক সম্পর্ক বিস্তারের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। সেজন্য সকল সার্বভৌম দেশ কিছু বৈদেশিক নীতিমালা প্রণয়ন করে যা তাদেরকে অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। শুরুতেই নেওয়া হয় সংবিধান রচনার কাজ। অতি স্বল্প সময়ে (অনধিক এক বছর) তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করেন। একটি নতুন জাতিসত্তার এটি এক অনন্য দলিল, যার মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে পরিচালিত হবে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে কি সম্পর্ক বজায় রাখবে, কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবে, কীভাবে তার উন্নতি সাধন হবে তার সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এই সংবিধানে সন্নিবেশিত আছে। আমাদের কূটনীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”। বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক মূলত এই মুলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। তবে এই মূলমন্ত্র আমাদের দেশের আপামর জনসাধারণ বান্ধব কিনা তা বিবেচনার বিষয়। কারণ কূটনীতির মূলমন্ত্র যাই হোক না কেন, আসল কথা হলো নিজ নিজ দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ সুসংহত করা।
বস্তুত পৃথিবীর সকল দেশ নিজ নিজ স্বার্থ অনুযায়ী অন্য দেশের সম্পর্ক স্থাপন করে। এই সকল স্বার্থ কখনো রাজনৈতিক, কখনো অর্থনীতিক, কখনো ভৌগলিক আবার কখনো অন্য কোনো বিষয়ে হতে পারে। সবকিছু যদি ঠিকঠাক মতো চলে, তখন বিদ্যমান সম্পর্ক কীভাবে আরও জোরদার করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া হয়। এভাবেই একটা দেশের সাথে আরেকটা দেশ তার বা তাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অব্যহত রাখে। আর এ সব কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সকল সার্বভৌম দেশ তার প্রয়োজন অনুযায়ী দেশে দেশে দূতাবাস স্থাপন করে, কূটনীতিক নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম না। তাইতো বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আনুমানিক ৭০টি দেশে দূতাবাস স্থাপন করেছে এবং আরও বেশ কিছু দেশে দূতাবাস স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের দূতাবাসগুলো কি আমাদের দেশ ও দেশের জনগণের হয়ে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে?
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের জনসংখ্যার চাপ অনেক, পাশাপাশি সম্পদের সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। দেশটির পক্ষে এককভাবে সব নাগরিকের জন্য জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা অদ্যাবধি সম্ভব হয়নি। তাইতো নাগরিকের একাংশকে জীবিকার তাগিদে দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বর্তমানে আমাদের দেশ যে অবস্থায় আছে এবং যে পদ্ধতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তা কখনোই আধুনিক বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না। এখানেই দরকার উন্নত বিশ্বের সাহায্য ও সহযোগিতা। আর ওইসব দেশের সাথে আমরা যত বেশি যোগাযোগ রক্ষা করতে পারব, তাদের আস্থা অর্জন করতে পারব তত বেশি মঙ্গল। এখানেই প্রয়োজন কুটনীতিকদের সুদীপ্ত পদচারণা। শুরু হয় দেশে দেশে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারী কাগজপত্র বিনিময় তথা সমঝোতা স্মারক, আর চুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা। এসব চুক্তি ক্ষেত্রভেদে স্বল্প মেয়াদী থেকে দীর্ঘ মেয়াদী ও আজীবনের জন্য হতে পারে। যে দেশ অন্য দেশকে যত বেশি আস্থায় নিতে পারবে, তার সম্পর্ক তত বেশি সুদৃঢ় হবে, এটাই বাস্তবতা। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে যে বিগত দিনগুলোতে আমাদের কূটনীতিকেরা কি আমাদের স্বার্থ রক্ষার্থে সেভাবে অবদান রাখতে পেরেছেন বা বর্তমানে পারছেন? হচ্ছে কি সম্পাদিত চুক্তিসমূহের সঠিক বাস্তবায়ন?
উদাহরণ স্বরূপ দুটি বিষয় সামনে আনতে চাই। একটি হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়, অন্যটি আমাদের দেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার সংক্রান্ত। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক নামিদামী দেশে আমাদের দেশের অসংখ্য লোক কর্মরত আছেন। তাঁরা কী কাজ করছেন বা কীভাবে করছেন সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের দূতাবাসের, সেখানে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কুটনীতিকদের। সেখানে আমাদের লোকজন খারাপ অবস্থায় থাকলে বা খারাপ কিছু করলে সেটা আমাদের ভাবমূর্তি অনেকখানি ক্ষুন্ন করবে, দেশগুলো আমাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে আস্থা হারাবে। পার্শ্ববর্তী বা অন্যান্য দেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এখন দেখা যাক আমাদের দেশের লোকজন কীভাবে বিদেশে যায় এবং কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়।
আমাদের দেশের কর্মঠ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে অনেক টাকাপয়সা খরচ করেন। পরিবারের উপার্জনকারী কোনো এক সদস্য (বাবা/ মা/ ভাই/ বোন) তার উপার্জনের বিরাট অংশ দিয়ে তার বা তাদের যোগ্য পোষ্য (ছেলে অথবা ভাই) কে বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন, সংসারের আয় উন্নতির আশায়। অপ্রিয় সত্য হলো যে, অনেকে টাকা খরচ করেও বিদেশে যেতে পারেন না, আবার অনেকে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হন। দেশি-বিদেশি দালালদের খপ্পরে পড়ে তার বা তাদের কোম্পানি পরিবর্তন হয়, কাজ পরিবর্তন হয়, বেতনের একটা অংশ দালালেরা নিয়ে যায়, বছর বছর নিজ খরচে ভিসা বা কাজের পুনর্নিয়োগাদেশ নিতে হয়। এগুলো সবই বৈষম্য, কেননা একই কাজে অন্য দেশ থেকে যারা যাচ্ছেন তারা এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হন না, তাদের এত টাকাও খরচ করতে হয় না। কারণ সেখানে তাদের দেশের কুটনীতিকেরা দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
দ্বিতীয়ত আমাদের দেশের একটি অশুভ চক্র বৈধ-অবৈধ উপায়ে অগাধ টাকা উপার্জন করে। পরবর্তীতে তারা সে অর্থের এক বিরাট অংশ অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করে। সেখানে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, বাড়ি-গাড়ি করে আয়েশি জীবনযাপন শুরু করে। এতে করে দেশে আর্থিক সংকটসহ শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টি হয়, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। যুগ যুগ ধরে এমন অবস্থা চলমান থাকায় আরও অনেকে এ চক্রে জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা বহুলাংশে দায়ী হলেও বৈদেশিক নিয়মনীতির শিথিলতার কারণে চক্রটি বিদেশে এ ধরণের অবৈধ কাজে সক্রিয়। শুরু থেকে এগুলো রোধকল্পে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো নজর দিলে, একটা পদ্ধতি অবলম্বন করলে দেশ থেকে আনুমানিক ১০ হাজার কোটির অধিক টাকা বিদেশে পাচার হতো না।
বিগত দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের অনেক চিঠি পত্র আদান প্রদান হয়েছে, সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিছু গোপনীয় ও অতি গোপনীয় বিষয় বাদ দিলেও অধিকাংশ বিষয় সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষ তেমন কিছুই জানতে পারেনি বা জানানো হয়নি। কেননা চুক্তি সম্পাদনের আগে ও পরে এগুলো নিয়ে আমাদের সংসদে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অতীতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব নিয়ম অনুসরণ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর বিষয়গুলো কোনো আলোচনা হয়নি। তাই বৈষম্য দুরীকরণের মাহেন্দ্রক্ষণে জনগণের সাথে আলোচনা না করে সম্পাদিত সকল চিঠিপত্র, সমঝোতা স্মারক, চুক্তি আপাতত স্থগিত রাখা দরকার। পরবর্তীতে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই বাছাইয়ে ওইগুলো আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করলে পুনরায় অনুসরণ যাবে। অন্যথায় ওই সকল চুক্তি/সমঝোতা স্মারক/চিঠিপত্র পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বাতিল বা নবায়ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে গোপনীয় ও অতি গোপনীয় বিষয়গুলি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দপ্তর, অধিদপ্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন, এটাই জনসাধারণের চাওয়া।
এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পারস্পারিক সুসম্পর্ক স্থাপনে আমাদের দূতাবাসগুলো তথা কুটনীতিকদের ভূমিকা অপরিহার্য। ধরে নেই দূতাবাসগুলো তাদের কাজ সঠিকভাবে পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মানুষের বৈধ অধিকার কি সংরক্ষণ হচ্ছে? প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেখানে কি তাদের চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন, কাজের পরিবেশ ও বেতন পাচ্ছেন? দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার কি রোধ হচ্ছে? বিদেশে আমাদের টাকা পাচারকারীরা কি চিহ্নিত হচ্ছে? পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা কি কুটনীতিকেরা নিচ্ছেন? সর্বোপরি বিদেশের সাথে আমাদের সম্পাদিত সকল চুক্তি কি দেশ ও দেশের মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করছে? এসব বিষয়ে দেশ ও দেশের সুবিশাল স্বার্থে কুটনীতিকদের শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ নাগরিকদের একান্ত প্রত্যাশা।
বর্তমানে বাংলাদেশ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আভ্যন্তরীণ নিয়ম শৃংখলা রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক আস্থা ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেখানে প্রচলিত কর্মপদ্ধতির বাইরে গিয়ে কুটনীতিকেরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভাবনী পদ্ধতি নিরূপনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এটাও জাতির প্রত্যাশা।
লেখক: কমডোর (অব.), বাংলাদেশ নৌবাহিনী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



