গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নারী সমতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক দিবস না হলেও এটি নারী অধিকার, নারীর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা নিয়ে আলোচনার বড় উপলক্ষ। বিশ্বের অনেক দেশেই নারীর সমতার লক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময় এমন দিবস পালিত হয়ে থাকে।
নারীর ভোটাধিকারের জন্য ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঊনবিংশ সংশোধনী গৃহীত হয়। এটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৭৩ সাল থেকে ২৬ আগস্টকে নারী সমতা দিবস ঘোষণা করে মার্কিন কংগ্রেস।
ভোট দেওয়াকে আজ যে রকম সর্বজনীন অধিকার বলে মনে হয়, এক সময় তা সে রকম ছিল না। নারী সমতা দিবসের গুরুত্ব হলো, ভোটের মতো একটি সাধারণ অধিকার অর্জন করতেও যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি কোনো নারী। ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস আসন্ন নির্বাচনে জিতলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই হবেন প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের এই দিবসটি আমাদের সমাজে নারীদের পরিস্থিতির দিকে তাকানোর একটি বড় সুযোগ। সম্প্রতি দেশে ছাত্র-জনতার যে গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল তাতে নারীরা অগ্রভাগে ছিল। এই আন্দোলন ঢাকার বাইরে দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতেও হয়েছে। সবখানে নারী শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি ছিল।
গত ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের নারী শিক্ষার্থীরা গেটের তালা ভেঙে যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল তা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতারা লাঠিসোঁটা হাতে যেভাবে চড়াও হয়েছিল তা বিরল। এরপর থেকে কিন্তু আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার হয়েছে।
এখন বন্যার্তদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ দেশের নানা জায়গায় ত্রাণ সংগ্রহ চলছে। এতেও নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।
বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদে ভারতে চলা আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে আরেক প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। এসব কর্মসূচিতে দেশের তনু ও কল্পনা চাকমাসহ নিখোঁজ, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার নারীদের ন্যায়বিচার চাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। ঘরে-বাইরে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি উঠেছে।
কলকাতার মতো বাংলাদেশে ‘মেয়েরা রাত দখল করো’ কর্মসূচি করেছে। কর্মসূচির নামটির মধ্যেই নারীদের লড়াইয়ের বিষয়টি স্পষ্ট। ‘রাত’ ও ‘দখল’ শব্দ দুটি নিয়ে ভাবলেই লাখো প্রশ্ন ও বিষয় চলে আসে। আমরা জানি, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নারীদের তুলনামূলক অগ্রগতি হলেও পুরুষদের সঙ্গে সমতা অর্জনে তা অনেক পিছিয়ে আছে। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে রাত এখনও নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। এ জন্যই কর্মসূচির নাম, ‘মেয়েরা রাত দখল করো’।
অথচ ৫৩ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশকে বেশির ভাগ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন নারীরা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেও চারজন নারী উপদেষ্টা রয়েছেন। কিন্তু এসব দিয়ে একটি সমাজে নারীদের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। তা বুঝতে হয় নীতি প্রণয়নের মতো বড় বড় বিষয়ের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিক দিয়ে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের লিঙ্গ সামাজিক নিয়ম সূচক (জিএসএনআই) অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ অন্তত একটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, পুরুষেরাই ভালো নেতা হয়। ৮৮ শতাংশ মনে করেন, ব্যবসা–বাণিজ্য নির্বাহী হওয়ার জন্য পুরুষেরাই বেশি যোগ্য। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ৯৯ শতাংশের বেশি নারীও কোনো না কোনোভাবে মনে করে পুরুষেরা বিভিন্ন কাজে তাদের চেয়ে বেশি যোগ্য।
আমাদের সমাজে নারীদের প্রতি মানুষের এই যে ভ্রান্ত ধারণা, তার মূল বেশ গভীরে। এর সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনৈতিক বিষয়, পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন গৎবাঁধা ধারণা জড়িত। ঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, দোকান-পাট, গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সর্বত্র নারীর প্রতি বৈরী ধ্যানধারণা ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত।
যদি নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা না করা যায়, উন্নয়ন ধারার সঙ্গে যদি লিঙ্গ সমতা নারীর মানবাধিকারের ধারণায় সম্পৃক্ত করা না যায়, তাহলে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না। সব ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ এবং অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
তাই জাতীয়, পেশাগত ও সামাজিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নীতি প্রণয়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘তথাকথিত ছোটখাটো’ বিষয়গুলো নিয়েও সবাইকে সচেতন হতে হবে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রতিযোগী বা প্রতিপক্ষ নয়, বরং ঐতিহাসিক সামাজিক ন্যায়ের ধারণা থেকে লিঙ্গ বা নারী সমতার বিষয়টি দেখতে হবে। নারী বা লিঙ্গ সমতার ডাককে ছোট পরিসর থেকে না দেখে সব ধরনের বৈষম্যবিরোধী প্রস্তাব হিসেবে দেখতে হবে। তাহলে নারীর অধিকার বা সমতার বিষয়টি আলগা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ধারণা বলে মনে হবে না।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, ইউএসএআইডি



