ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে বলে কয়েক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তা আর হচ্ছে না। এবার মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বললেন, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই স্বাভাবিক হতে যাচ্ছে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক। এমনকি কমলা হ্যারিস নির্বাচনে জিতলে এই চুক্তি সহজে বাস্তবায়ন হবে বলে জানিয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের এক মুখপাত্র। অর্থাৎ, সৌদি–ইসরায়েল সম্পর্ক মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্ড হিসেবে সামনে হাজির হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, গতকাল বুধবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এ নিয়ে আলাপ করেছেন দুজন। এ বছরের শেষদিকেই সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরই এই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। এমনকি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ নিয়ে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি। তবে কাজটা কী করছেন, তা জানাননি।
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে প্রচারে রয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি মিশিগানে ভোটের মাঠে রয়েছেন।
সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ড গঠন করার কথা বলা হচ্ছে। সৌদি তাতে যুক্ত হতে পারে। আর এমন হলে ব্যাপ্তি বাড়বে এই নিরাপত্তা জোটের।
তবে গত কয়েক মাস ধরেই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য আসছে না সৌদি আরবের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি ইরান, লেবানন ও ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণের পর সৌদি আরব এক ধরনের ‘মৌনতা’ পালন করছে। এ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে কিছু বলেনি দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।
এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটের অন্যতম ‘অস্ত্র’। ট্রাম্পের প্রচারে যুক্ত সিনেটর দাবি করছেন, ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প এই সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক করে দেবেন। এদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও এটা নিয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর পক্ষের এক মুখপাত্র।
কমলা হ্যারিসের ক্যাম্পেইনে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মুখপাত্র মরগার ফিনকেলস্টেইন বলছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কমলা হ্যারিস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে বাকি দেশগুলোর সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে সৌদির সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। কমলা হ্যারিস বিশ্বাস করেন, এভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ইরানের হুমকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।’
ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে এমন আভাস পাওয়ার পর রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা এমন বললেও ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে এ কাজে তারা বাধা দেবে। এতে করে চুক্তি বাস্তবায়িত হতে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। এ ছাড়া রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছিল, তা ঠিক করতে উদ্যোগী হন জো বাইডেন। কিন্তু গত বছরের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর এসব উদ্যোগ থমকে যায়।
মার্কিন নীতি অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে হলে মার্কিন সিনেটের তিনভাগের দুই ভাগ সমর্থন দরকার হয়। অর্থাৎ, তাতে সমর্থন থাকতে হবে ৬৭ জন সিনেটরের। কমলা কিংবা ট্রাম্প, যিনিই জয়লাভ করেন না কেন এটি হওয়া তেমন জটিল হবে না।
কিন্তু সংকট অন্য জায়গায়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ব্যতিত এই চুক্তিতে আসতে চাইবে না সৌদি আরব। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এমনটাই বলেছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরব-ইসরায়েলি শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদির আলোচনার বিষয়টি জানানো হয়।
এতে বলা হয়েছিল, সৌদি আরব আমেরিকার প্রশাসনকে তার দৃঢ় অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে না। সেই সঙ্গে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। দখলদার বাহিনীকে গাজা উপত্যকা থেকে সরতে হবে।
এখনো সৌদি আরব এই অবস্থানে রয়েছে কিনা, তা পরিষ্কার করেনি।
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম মনে করছেন, যেভাবেই হোক কোনো একটা সমাধান আসবে। আর তাতে হয়তো ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বও আসতে পারে এবং সেখান থেকে সেনাও সরানো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি।’
তবে এই পথ আসলে কোনদিকে, তা পরিষ্কার করে বলেননি রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। এমনকি কমলা হ্যারিসের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমেও এ নিয়ে নেই বিস্তারিত। আপাতত নির্বাচন সামলানোর চিন্তায় রয়েছে দুই প্রতিপক্ষ শিবির। আর তাতে এই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু হয়ে উঠেছে জুয়ার অন্যতম ‘কার্ড’।


যেসব সমস্যায় পড়তে পারে আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের ফল
