বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বহু বাক্যব্যয় করেছেন ও করছেন গুণিজনেরা। পাঠক্রম নিয়ে ছেলেখেলা আমাদের রক্তে। দেশের প্রতিটি মানুষেরই শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা খাত নিয়ে হাজারটা পরামর্শ আছে। সামাজিক মাধ্যমের এই যুগে ফেসবুক‑ইউটিউবে মুখে ফেনা তুলে ফেলা কিংবা কি‑বোর্ড চাপতে চাপতে আঙুলের ডগা অবশ করে ফেলা বোদ্ধার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এর সাথে কমেন্টবক্সে ঢুকলে দেখা যাবে, এই সংখ্যা গুণিতক হয়ে দেশের প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ছুঁইছুঁই। কিন্তু তাতেই‑বা কী ঘণ্টা হলো এত দিনে?
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই যেন ক্ষমতাপ্রত্যাশী ও ক্ষমতাধরদের তালুক। আর শিক্ষার্থী? শিক্ষার্থীর তপস্যা তো কবেই চুরি গেছে এই দেশ থেকে। শিক্ষার্থীর অর্থ এখন দাঁড়িয়েছে দাবার বোড়ের মতো। কার? ক্ষমতা নিয়ে যারা জুজুধান, তাদের। এ ওর হাত, তো ও তার।
শিক্ষার্থী‑জনতা (যাকে জনপ্রিয়ভাবে বলা হচ্ছে ছাত্র‑জনতা) ফুঁসে উঠে একযোগে একটা ক্ষমতার রদবদল ঘটিয়ে ফেলল। তারপর তাদের একাংশ ঘরে ফিরল, আরেকাংশ পথেই থাকল। প্রথম অংশের সাথে ঘরে ফিরল জনতারও বড় একটি অংশ। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী ধারণাটা যেই তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই ফিরে ভাতঘুম দিয়ে দিল।
কত শানদার আলাপ উঠল–শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে। কিন্তু কোথায় কী? পাঠক্রম থেকে হুড়াতাড়া করে কিছু অংশ বাদছাদ দিয়ে একটা কিছু দাঁড় করানো হলো। আর এটা যখন করা হচ্ছে, তখন শিক্ষার্থীদের নানা অংশ নানা দাবি নিয়ে নিয়ত হল্লা করতে থাকল। সেই হল্লার ফল হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষাও পিছু হটল। সাথে কি শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষার্থীরাও পিছু হটল না? হটল, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারল না। একটা কমিশন হলো বটে। তবে তা সমাজের একাংশের, বলা ভালো এক ব্যক্তি ও তাঁর অনুসারীর এক ধমকে অপসৃত হলো। অবশ্য ধমকটি অতটা গ্রাহ্য হতো না, যদি দেশের ঘরে ঘরে ‘শিক্ষাবিদ’ না থাকত।
এই ‘শিক্ষাবিদ’ নিয়েও অবশ্য নানা ঝক্কি আছে। এই বঙ্গমুলুকে যেকোনো বিদ্যান লোক একটু পরিচিতি পেলেই এবং তার সাথে তাঁর শিক্ষক পেশার একটা যোগ থাকলেই তাঁকে শিক্ষাবিদ বলে প্রচারমাধ্যমগুলোতে আরামসে প্রচার চালানো হয়। বাস্তবে হয়তো দেখা গেল যে, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর তেমন কোনো দক্ষতাই নেই। তিনি হয়তো অন্য কোনো বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ, দক্ষ। অথচ তাঁকে গোটা প্রচারমাধ্যম শিক্ষাবিদ বানাতে রীতিমতো উঠেপড়ে লাগে। ফলে তিনিও একসময় নিতান্ত অনিচ্ছায় শিক্ষাবিদের বড়িটি গেলেন। শুধু গেলেনই না, গোটা জাতিকে কোমর বেঁধে শিক্ষা দেন।
সে যাক। আগের কথায় ফেরা যাক। ৫ আগস্টের পর হুট করেই আলাপ উঠেছিল, দেশে ছাত্ররাজনীতি থাকতে পারবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরাও এই এক ভাষ্য নানা বক্তব্যের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন। অথচ ভুলেই গেলেন যে, রাজনৈতিক কাঠামো বদল যে আন্দোলনের মাধ্যমে ঘটে, তাও ঘোরতরভাবেই রাজনৈতিক। এমনকি সেই সাধারণ সত্যটিও তাঁরা ভুলে গেলেন যে, ‘আপনি রাজনীতি করুন বা না করুন, রাজনীতি আপনাকে যুক্ত করাবে।’ এই ‘করা’ অর্থ বহুবিধ।
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের এই আবেগীয় দাবিটির কার্যকারণ অবশ্যই আছে। সেই কার্যকারণ কিন্তু ‘ছাত্ররাজনীতি’ নয়, ‘ছাত্রঅপরাজনীতির’ মধ্য দিয়ে উদ্ভূত। কিন্তু মাথাব্যথা সারাতে মাথা কাটার দাওয়াই হাজির করে বসলেন, সেই সব লোকেরা, যারা জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন। এই অবস্থানের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যে রাজনৈতিক অধিকার, তা ফিরিয়ে দেওয়ার আলাপটাই অপসৃত হলো ভীষণভাবে। আলাপটা চললে এত দিনে হয়তো বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এ বিষয়ে একটা মতৈক্য হতে পারত। নিদেনপক্ষে একটা অগ্রগতির দিকে আমরা যেতে পারতাম। কিন্তু তেমনটি হলো না।
ফলে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী পক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের আবারও লাঠিয়ালের পদে নিযুক্ত করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন চর বা তালুক শুধু, যা দখলে নেওয়াই দস্তুর। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে। বেশি দূর যেতে হবে না। শুধু গত সপ্তাহে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে বিষয়টি। ঢাকায় সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। এটা ৫ আগস্টের পর তাদের সংঘর্ষ ২.০। চট্টগ্রামের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছুদিন পরপরই সংঘর্ষ হচ্ছে। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী‑ছাত্রদল সংঘর্ষে ৪ জন আহত হয়েছে। (প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর ২০২৪)। যদিও এ ঘটনায় ছাত্রদলের অভিযোগ অপরপক্ষ মোটেই সাধারণ শিক্ষার্থী নন, তাঁরা শিবিরকর্মী। যদিও ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এমন অস্বীকার অবশ্য চট্টগ্রাম কলেজে হওয়া সংঘর্ষের সময়ও করা হয়েছিল। যদিও ছাত্রদল এই অস্বীকৃতি মানতে নারাজ। রাজশাহীর ক্ষেত্রে এক ছাত্র সমন্বয়ককে হাতুড়িপেটার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতা‑কর্মীদের বিরুদ্ধে। এখানে ছাত্রদল নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। (প্রথম আলো, ২২ নভেম্বর ২০২৪)।
উদাহরণের বহর আপাতত এখানে থামানো যেতে পারে। কারণ, চলতে দিলে এর কোনো হুঁশ থাকবে না। ঘটনা তো কম নয়। এর সাথে যদি ৫ আগস্টের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক হেনস্তার প্রসঙ্গ টানা হয়, তবে এই উদাহরণের তালিকা রীতিমতো অজগর হয়ে যাবে।
এসবকে পাশ কাটিয়ে প্রবণতার দিকে চোখ ফেরানো যাক। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিকে না বলতে চেয়েছে, বলেছে। তারা রাজনৈতিক ময়দানে দাঁড়িয়ে, প্রচণ্ড রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি করেও রাজনীতি চাইছে না বলে জানিয়েছে। এই না চাওয়ায় অনেকে নানা অভিসন্ধি খোঁজেন। এই খোঁজার কারণ অবশ্য তাদের বচন ও করণের অমিল। এর ফল হলো–তাঁরা নিজেরা (অর্থাৎ, সামনের সারির সমন্বয়কেরা, যাদের একাংশ উপদেষ্টা পরিষদে এবং আরেকাংশ ময়দান গরমে ব্যস্ত) রাজনীতির সাথে সকল ধরনের গাটছড়া বাঁধলেও, হঠাৎ করে রাজনৈতিক অধিকার সচেতন হয়ে ওঠা সত্যিকারের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ আবার বিমুখ হলো। তাদের ক্ষণিকের রাজনৈতিক সচেতনতার সলতে ‘ছাত্ররাজনীতি নয়’ শব্দবন্ধে আটকা পড়ে নিভে গেল। এই অগণিত সাধারণেরা রাজনীতি করবেন না বলেই হয়তো ঠিক করে বসলেন। কিন্তু ক্লাসরুমেও ঠিকঠাক ফিরলেন না। ফলে এই সুযোগে রাজনীতি তাদের যুক্ত করতে শুরু করল।
একটু চোখ মেললে দেখা যাবে, দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু মোটাদাগে ঠিকঠাক চলছে। মোটাদাগে বলা হচ্ছে কারণ, এই বেসরাকরি প্রতিষ্ঠানগুলোরও একটা শ্রেণিকরণ আছে। এরও আছে উচ্চ‑মধ্য‑নিম্ন। দেখা যাবে উচ্চ ও মধ্য শ্রেণির বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় নির্বিঘ্নভাবেই ক্লাস‑পরীক্ষা নিয়ে এগোতে পারছে। ফ্যাসাদে পড়ছে পাবলিক, সরকারি ও নিম্নশ্রেণির বেসরাকরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোর রাজনৈতিক ময়দান (যত অস্বীকারই করা হোক না কেন, এ ময়দানটি আছে ও থাকবে) কেউ নীরবে (ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের মতো দাবির লেবাসে) এবং কেউ সরবে দখলের চেষ্টা করছে। কাদের দিয়ে? ওই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা আরকি। অর্থাৎ, তুলনায় মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিতে এই হতভাগ্যদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা দখলে নিচ্ছে, তাদের সন্তানেরা তো হয় বিদেশে, নয় তো দেশের উচ্চশ্রেণির বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আছে। ওটা নির্বিঘ্ন থাকলেই তো হয়।
রাজাকে তো বাঁচতেই হবে। আর রাজ্য পরিচালনার দায় নিতে হলে শিখতেও হবে বিস্তর। শিখলেই না বাকিদের, মানে বিপুল প্রজা‑সাধারণকে শিক্ষা দিতে পারবে। আর এই শিক্ষা দেওয়ার কাজটা তো তাঁরা নিজে করবেন না। প্রজা দিয়েই প্রজাকে শিক্ষা দেবেন। তাই একটু হাত মকশো করানো হচ্ছে আরকি। এ কোনো নতুন কিছু নয়। পুরোনো বাংলাদেশই।
পুরোনো ও আবহমান বাংলাদেশে শিক্ষা দেওয়া একটা বেশ আনন্দদায়ক ব্যাপার। এখানে সবাই সবাইকে শিক্ষা দিতে ব্যস্ত। ওই যে প্রায়ই বলেন না যে, ‘এমন শিক্ষা দিমু, তখন বুঝবা’–তেমনই একটা ব্যাপার। এখানে ‘শিক্ষা দেওয়া’ বিষয়টি কোনো জ্ঞান বিতরণের মতো ব্যাপার নয়। রীতিমতো শারীরিক ও মানসিক পীড়নের সাথেই এর যোগ বেশি। তাই এখানে ‘শিক্ষাবিদ’ খেতাব গ্রহণপূর্বক আমাদের নানা ক্ষেত্রের বিদগ্ধজনেরা জাতিকে নারকীয় আনন্দে কোমর বেঁধে শিক্ষা দিতে নেমে যেতে পারেন। কোনো দ্বিধা কাজ করে না। প্রণম্য শিক্ষকেরা একবারও নিজের পোর্টফোলিও ঘেঁটে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নিজের ‘অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাহীনতা’ খুঁজে বের করে বলেন না যে, ‘আমি নিতান্ত শিক্ষক, শিক্ষাবিদ নই’। বরং ডাকামাত্র নাচতে নাচতে অনেকেই এগিয়ে যান পাঠপ্রণয়নে নিজের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত অবদানটি রাখতে, যেন‑বা ব্যাংকনোট–চাহিবামাত্র দিতে বাধ্য থাকিব। শুধু যানই না, রেকর্ড স্বল্প সময়ে পাঠক্রম পরিমার্জন, পরিবর্ধন ইত্যাদি করে বসেন।
কারণ, দেশের তথাকথিত শিক্ষাবিদেরাও জাতিকে ‘এয়সা শিক্ষা’ দিতে চান, যেন এই গণ্ডমূর্খের দল ‘শিক্ষিত’ হয়ে ওঠে। রাজার মতোই তাঁরাও বোঝেন–শিক্ষা মানেই দালান, ক্লাসরুম, কয়জন মাস্টার, আর একগাদা ঢুলে ঢুলে পড়তে থাকা শিক্ষার্থী, যাদের ততটুকুই শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, যতটুকু হলে সে হতে পারবে রাজার প্রকৃত সেবক। সেই রাজার সেবক, যার আছে শুধু দখল ও লুটের ধর্ম। তাই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজা ও ভাবি‑রাজারা চর বা তালুক এবং এর শিক্ষার্থীদের লেঠেল ভাবাটা দোষের কিছু নয়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


রণক্ষেত্র সায়েন্সল্যাব, ঢাকা-সিটি কলেজের বহু শিক্ষার্থী আহত
সিটি কলেজকে স্থানান্তরের দাবি ঢাকা কলেজ শিক্ষকদের
