ডেঙ্গু হচ্ছে এক ধরনের ভাইরাস জ্বর। এই রোগের বাহক হচ্ছে এডিস মশা। গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা। গর্ভকালীন শারীরিক অবস্থা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হওয়ার কারণে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাবের সময় গর্ভবতী নারীরা বেশ ঝুঁকিতে থাকেন। এই সময় ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় জটিলতাও অনেক বেশি হতে পারে। তাই এই রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গর্ভবতী মায়েদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।
লক্ষণ
তীব্র জ্বর ও শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, হাতে–পায়ে ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমিভাব, প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া, গ্যাস্ট্রিকের প্রদাহ বেড়ে যাওয়া, তলপেটে ব্যথা, মূত্রসংবহনতন্ত্রের সংক্রমণ, বদহজম, ডায়রিয়া এবং নাক, দাঁত বা মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ।
ঝুঁকি
- গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া এমনকি গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে।
- গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে গর্ভবতী মায়েদের ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
- গর্ভকালীন শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের ফলে গর্ভবতীর সংক্রামক রোগে আক্রান্তের আশঙ্কা বেশি থাকে ফলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দেয়, এতে মা ও শিশু উভয়েরই মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
- গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
- ডেঙ্গু আক্রান্ত গর্ভবতীর বুকে পানি জমে শ্বাসকষ্ট হওয়া, লিভারের সমস্যা, রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
- গর্ভাবস্থার শেষ দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মায়ের কাছ থেকে শিশুতে ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস সরাসরি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
- ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে নরমাল ডেলিভারি/সিজারের সময় বা পরে আকস্মিক রক্তপাত হতে পারে।
সতর্কতা
- বাড়িতে মশারি, মশা নিরোধক ব্যবহার করতে হবে, গায়ে রিপেলেন্ট মেখে থাকা উচিত।
- বাড়ির আশেপাশে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে।
- গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করতে হবে।
- বাড়িতে বা আশেপাশে কারো ডেঙ্গু হলে বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
- ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণ বা বিশ্রামে যাওয়া উচিত নয়।
- ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় জ্বর হলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
- খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ব্যথার ওষুধ দিয়ে বা অপারেশনের মাধ্যমে ডেলিভারি না করানো।
- ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
- হাসপাতালে প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর রোগীর পালস, প্রেসার, ইউরিন আউটপুট পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
- হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীর হিমোগ্লোবিন, হিমাটোক্রিট ও প্লাটিলেটের কাউন্ট দেখতে হবে।
- জ্বর নিরাময়ে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না।
- আগে থেকে কেউ অ্যাসপিরিন খেয়ে থাকলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বন্ধ করে দেওয়া ভালো।
- পানি/তরল বেশি খেতে হবে।
- ডেলিভারির সময় হলে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিমের তত্ত্বাবধানে ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে।
দিন দিন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়ায় সারা দেশের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। ছোট্ট শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ কেউই ডেঙ্গুর হাত থেকে নিরাপদ নয়। তবে সবচেয়ে বেশি জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হয় গর্ভবতী নারীদের। তাই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় গর্ভবতী নারীদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। এবং অবশ্যই প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত চিকিৎসা নিতে হবে।
লেখক: প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ


ব্লাড ক্যানসার কেন হয়? কোন কোন জীবাণুর কারণে ব্লাড ক্যানসার হয়?
অতিরিক্ত স্টেরয়েড খেয়ে নিজের ক্ষতি করছেন কি?
