খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। তিনদিন আগের কথা। সেদিন লক্ষ্মীবাজারের মতো জায়গায় গিয়ে দেখলাম, একজন নারী ফুডকোর্টে খাবার বিক্রি করছেন। এই দৃশ্য দেখে বেশ কৌতূহল নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলাম।
যার কথা বলছি, তাঁর নাম সুমি। এইচএসসি পরীক্ষার পর সুমির বিয়ে হয় একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। পুরান ঢাকার পটুয়াখালীতে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। বিয়ের পর সংসারের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দুই সন্তানের মা হন। শুরুর দিকে তাঁর সংসার ছিল সুখের। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে, সংসারের খরচও বাড়তে থাকে।
একদিকে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, অন্যদিকে সংসারের খরচ তাঁর স্বামীর পক্ষে বহন করা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। স্বামীর কষ্ট দেখে সুমি মনে মনে কাজ করার কথা ভাবেন। কিন্তু চাকরি করে সংসার সামলানো কষ্টসাধ্য হবে, তাই চিন্তা–ভাবনা করে ঠিক করলেন অনলাইন ব্যবসা করবেন।
সুমি ভালো রান্না করেন। এ কথা ভেবে সুমি ২০১৯ সালে অনলাইনে রান্নার ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু অনলাইনে তেমন আয় না হওয়ায় আশাহত হয়ে ব্যবসাটা ছেড়ে দেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামী বাইরে খাবারের দোকানের বিষয়ে সুমিকে অনুপ্রাণিত করেন।
এরপর ২০২৪ সালে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে সুমি একটি ফুডকোর্ট চালু করেন। বর্তমানে এই ফুডকোর্ট থেকে প্রত্যাশা তুলনায় বেশি আয় হচ্ছে।
লক্ষ্মীবাজারের মতো কোলাহলপূর্ণ জায়গায় একা খাবার দোকান পরিচালনা করা খুব একটা সহজ না। কখনো কী কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন? এ প্রসঙ্গে সুমি বলেন, ‘কোনো কাজে যদি পরিবারের সহযোগিতা থাকে, তাহলে গোটা বিশ্ব জয় করা সম্ভব।’
আরেক চা বিক্রেতার গল্প
বাসা থেকে অফিস যাওয়ার পথে সেদিন দেখলাম. ভিক্টোরিয়া পার্কে এক নারী তাঁর শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করছেন। ভীষণ কৌতূহল নিয়ে তাঁর থেকে চা পান করলাম। সেই চা ছিল অনেক দুর্দান্ত, একদম ঘরের তৈরি চায়ের মতো। চা পান করতে করতে আমার মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই নিজের আগ্রহকে দমতে না দিয়ে তার কাছ থেকে সরাসরি জানতে চাইলাম, এই শীতের মধ্যে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে এভাবে চা বিক্রি করছেন কেন?
এ কথা শুনে তিনি বললেন, আমাদের দেখার মতো কেউ নেই, তাই চা বিক্রি করছি।
যার কথা বলছি, তাঁর নাম ফারহানা। তাঁর বয়স ১৮ বছরের কম হতে পারে। পরিবার অল্প বয়সে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়, তাই বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। তবে, ফারহানা এএসসি তে গ্লোন্ডেন এ+ পেয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু পরিবারের কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি।
ফারহানার স্বামী একজন সরকারি কর্মকর্তা। বিয়ের এক বছরের মাথায় তিনি এক কন্যা সন্তানের মা হন। কন্যা সন্তানের হওয়ার কারণে স্বামী তাকে বিভিন্নভাবে অমানুষিক অত্যাচার করতেন। আবার নেশা করে বাসায় এসেও স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন। এসব সহ্য করতে না পেরে বাবার কাছে আশ্রয় নেন ফারহানা। কিন্তু বাবাও তাকে ফিরিয়ে দেন। সুমির বাবার ভাষ্য, মেয়েদের সব মুখ বুঝে সহ্য করতে হয়। পুরুষ মানুষের একটু আধটু দোষ থাকবেই, সেটা নারীদের মানিয়ে চলতে হয়।
বাবার কাছে আশ্রয় না পেয়ে শেষে সন্তানকে নিয়ে ফারহানা চা বিক্রি করে নিজের জীবন চালাচ্ছেন।
আমাদের সমাজে সুমি আর ফারহানার মতো পরিবারের সংখ্যা বেশি। সুমির শ্বশুরবাড়ির মতো পরিবার বাংলাদেশে অনেক কম দেখা যায়। তথাকথিত সমাজের ধারণা বাদ দিয়ে যদি সুমির শ্বশুর বাড়ির মতো পরিবার আমাদের সমাজে থাকতো, তাহলে গোটা বিশ্ব আরো অনেক সুন্দর হতো।
সমাজ নারীদের অনেক দুর্বল ভাবে। তবে নারীরা দুর্বল নয়, নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা আমাদের চিন্তা–ভাবনার জায়গাটা সহজ ও সুন্দর করি।


ফ্যানি বুলকের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা
পলিথিনের বিরুদ্ধে সিলসিলার লড়াই
নৌপথে প্রথম নারী হিসেবে যিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন
