ধূমপান হার্ট ও রক্তনালীতে তাৎক্ষণিক কিছু প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সিগারেটের ধোঁয়ায় যে কার্বন মনোক্সাইড থাকে তা রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ধূমপানের এক মিনিটের মধ্যে হার্টের স্পন্দন বাড়তে শুরু করে এবং প্রথম দশ মিনিটের মধ্যে হার্ট রেট প্রায় দশ শতাংশ বেড়ে যায়।
ধূমপানের ফলে হার্ট ডিজিজ, ব্রেইন স্ট্রোক, প্রান্তীয় রক্তনালির রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। তামাকের কিছু কিছু উপাদান রক্তনালিকে সরু করে দেয় (অ্যাথেরোসক্লেরোসিস) ফলে ব্লকেজ এর সম্ভাবনা বাড়ে যার ফলে হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চল্লিশ বছরের কম বয়সী ধূমপায়ীর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা পাঁচগুণ বেড়ে যায়। আমেরিকান বায়োলজিস্টদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের ধোঁয়া কার্ডিয়াক পেশির কোষ বিভাজনকে প্রভাবিত করে এবং হার্টের আকৃতির পরিবর্তন ঘটায়। ধূমপানের ফলে বার্জার’স ডিজিজ হতে পারে। এই রোগে হাত ও পায়ের ধমনি ও শিরায় প্রদাহ হয় এবং থ্রম্বোসিস বা রক্ত জমাট বেধে যায়। ফলে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে ঘা বা ক্ষত তৈরি হতে পারে, এই ক্ষতের কারণে পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপারেশন করে ফেলেও দেওয়া লাগতে পারে।
ধূমপান পাচনতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, পেপটিক আলসার এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যায় অবদান রাখে। এটি খাদ্যনালি এবং পাকস্থলীতে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সিগারেটের ধোঁয়ার ক্ষতিকারক পদার্থগুলি পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে, যার ফলে অস্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
গর্ভবতী নারীদের উপর তামাকের ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ধূমপায়ী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটার হার বেশি। এছাড়া গর্ভস্থ ভ্রূণেরও অনেক ক্ষতি করে যেমন অকালে শিশুর জন্ম হওয়া (প্রিম্যাচুর বার্থ), জন্মের সময় নবজাতকের ওজন আদর্শ ওজনের তুলনায় কম হওয়া (LBW) ও সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম (SIDS) এর হার ১.৪-৩ শতাংশ বেড়ে যায়। অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে যৌনমিলনের সময় লিঙ্গ উত্থানে অক্ষমতার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার হার ৮৫ শতাংশ বেশি।
ধূমপান ডিম্বাশয়ের জন্য ক্ষতিকর এবং বন্ধ্যত্বের অন্যতম কারণ। সিগারেটের নিকোটিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরিতে বিঘ্ন ঘটায়। এই হরমোনটি ডিম্বাশয়ে ফলিকল উৎপাদন ও ডিম্বপাত নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ধূমপান জরায়ু ও ভ্রূণের আরো অনেক ক্ষতি করে। এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে ধূমপানের সময়কাল ও পরিমাণের উপর। কিছু ক্ষতি অপূরণীয় তবে ধূমপান ত্যাগ করলে অনেক ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ধূমপায়ী নারীর বন্ধ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশের বেশি।
ধূমপানের কারণে কেন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে
ধোঁয়া বা যেকোনো আংশিক পোড়া জৈবযৌগতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ (কার্সিনোজেন) বলে থাকে। ধূমপানের সম্ভাব্য পরিণতি যেমন ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ প্রকাশিত হতে প্রায় কুড়ি বছর সময় লাগে। নারীরা ব্যাপকহারে ধূমপান করা আরম্ভ করে পুরুষদের অনেক পরে। এজন্য নারীদের ক্ষেত্রে ধূমপানজনিত মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেতে অনেক সময় নেয়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুস ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়া শুরু করে ১৯৭৫ সালের দিকে, যা কিনা গড়ে ধূমপান করা কমিয়ে ফেলার কুড়ি বছর পর। নারীদের ক্ষেত্রেও গড় ধূমপানের হার কমতে শুরু করে ১৯৭৫ সালের দিকে কিন্তু ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে ফুসফুস ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার হ্রাস পায়নি।
ধূমপানে কিছু ক্যানসার সৃষ্টিকারী পাইরোলাইটিক যৌগ থাকে, যা ডিএনএ (DNA) এর সাথে যুক্ত হয়ে জেনেটিক মিউটেশন করে। বিশেষত শক্তিশালী কার্সিনোজেন যেমন পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন, যা মিউটাজেনিক ইপক্সাইডে পরিণত হয়ে আরো বিষাক্ত হয়ে উঠে। বেনজোপাইরিন হলো প্রথম পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন, যা ধূমপানে ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়। এটি ইপক্সাইডে পরিণত হয়ে কোষের নিউক্লিয়ার ডিএনএ এর সাথে স্থায়ীভাবে বন্ধন তৈরি করে, ফলে কোষটি হয় মৃত্যুবরণ করে অথবা মিউটেশন হয়। যদি মিউটেশন হওয়া কোষটি অ্যাপোপটোসিস বা প্রোগ্রামড সেল ডেথ–এর মাধ্যমে ধ্বংস না হয়, তাহলে সেটি ক্যানসার কোষে পরিণত হয়। একইভাবে অ্যাক্রোলিন নামক আরেকটি যৌগ একই পদ্ধতিতে ক্যানসার করতে পারে, তবে এটি সরাসরি কাজ করতে পারে। সিগারেটে ১৯টির বেশি রাসায়নিক পদার্থ আছে, যেগুলো ক্যানসারের জন্য দায়ী।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম


ধূমপান না করলেও হচ্ছে ক্যানসার, কারণ কী?
ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি: প্রেক্ষাপট-বাংলাদেশ
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানে স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
