বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আয়ারল্যান্ডে দাঁড়িয়ে যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কোথা থেকে এসেছেন?’ আমি গর্ব করেই বলি, ‘বাংলাদেশ।’ এরপর প্রায়ই আরেকটি প্রশ্ন আসে, ‘বাংলাদেশি কয়েকটি খাবারের নাম বলুন তো?’
এই প্রশ্নের উত্তরে আমি ইলিশ, কাচ্চি বিরিয়ানি, ভুনা খিচুড়ি, মেজবানি গরুর মাংস, সাতকড়া, শুঁটকি আর নানা ধরনের ভর্তা ও পিঠার কথা বলি। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, এসব খাবারের নাম অনেকেই প্রথমবার শুনছে। আয়ারল্যান্ডে এসে বাংলাদেশের খাবারকে আমিও নতুন করে চিনেছি। কারণ দেশের বাইরে এসেই বুঝতে পেরেছি, আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ। কিন্তু বিশ্বের কাছে আমরা তার কিছুই উপস্থাপন করতে পারিনি।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক কিচেনে কাজ শুরু করি। তখন লক্ষ্য ছিল একজন ভালো শেফ হওয়া। নতুন নতুন কুইজিন শেখা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞ শেফদের সঙ্গে কাজ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করা। সেই পথচলায় মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচতারকা হোটেল, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রি-ওপেনিং টিম এবং বিভিন্ন দেশের এক্সিকিউটিভ শেফদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, একজন শেফের পরিচয় শুধু রান্নাঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। আপনি যত দূরে যাবেন, নিজের শেকড়কে তত বেশি অনুভব করবেন।
ইউরোপে কাজ করতে এসে দেখেছি, একটি দেশের খাবার শুধু খাবার নয়। সেটি সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের অংশ। আইরিশরা তাদের ‘আইরিশ স্ট্যু’ নিয়ে গর্ব করেন। ব্রিটিশদের ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, ইতালিয়ানদের ‘পাস্তা’, স্প্যানিশদের ‘পায়েয়া’ কিংবা জাপানিদের ‘সুশি’। সবই জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
এসব পরিচয় রাতারাতি তৈরি হয়নি। গবেষণা, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ, ব্যবসা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গল্প বলার মধ্য দিয়ে এসব কুইজিন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। তখনই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের খাবারের ক্ষেত্রেও আমাদের অনেক কাজ বাকি।
আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির শক্তি বৈচিত্র্যে। একেক অঞ্চলের স্বাদ একেক রকম। দেশের ৬৪ জেলার খাবার, উপকরণ ও রান্নার ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর পার্থক্য। কিন্তু এই ঐতিহ্যের বড় একটি অংশ এখনো লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি। অনেক রেসিপি সীমাবদ্ধ আছে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের স্মৃতিতে। তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বহু অমূল্য রান্নার গল্পও।
আন্তর্জাতিক কিচেনে সহকর্মীদের যখন বলি, বাংলাদেশে শুধু এক ধরনের বিরিয়ানি নয়। বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব বিরিয়ানির ঐতিহ্য রয়েছে, তারা অবাক হন। সাতকড়া, মেজবানি, শুঁটকি কিংবা ভাপা পিঠার গল্পও তাঁদের আগ্রহী করে তোলে। তখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, মানুষ বাংলাদেশের খাবার সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু তাদের জানাতে হলে আগে আমাদেরই নিজেদের গল্প বলতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, একজন বাংলাদেশি শেফ যখন বিদেশের কোনো কিচেনে কাজ করেন। তখন তিনি শুধু একজন পেশাজীবী নন। তিনি নিজের দেশেরও প্রতিনিধি। তার কাজ, পেশাদারিত্ব এবং জ্ঞানের মাধ্যমে অন্যদের কাছে বাংলাদেশের একটি ছবি তৈরি হয়।
বর্তমানে আমি ইউরোপিয়ান ও ব্রিটিশ কুইজিন নিয়ে কাজ করছি। কিচেন ম্যানেজমেন্ট, ফুড সেফটি, মেনু ডেভেলপমেন্ট, কস্ট কন্ট্রোল ও আধুনিক উপস্থাপনার নানা দিক প্রতিদিন শিখছি। তবে অন্য দেশের কুইজিন শেখার অর্থ নিজের দেশের খাবারকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং আমি মনে করি, বিশ্বের সেরা চর্চাগুলো শেখার মধ্য দিয়েই একদিন বাংলাদেশের কুইজিনকে আরও শক্তভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা সম্ভব।
আমার স্বপ্ন, একদিন কোনো ইউরোপিয়ান শেফ বাংলাদেশের নাম শুনলে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে নয়। বরং কয়েকটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশি খাবারের নামও বলতে পারবেন। বিশ্বের বড় হোটেলের বুফেতে বাংলাদেশি খাবারের আলাদা জায়গা থাকবে। আন্তর্জাতিক রেস্টুরেন্টগুলোতে বাংলাদেশি উপাদান ও স্বাদ নিয়ে কাজ হবে। বিদেশি শেফরা বাংলাদেশে এসে আমাদের খাবার শিখতে আগ্রহী হবেন।
তবে শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না। প্রয়োজন গবেষণা, রেসিপি সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ শেফ তৈরি করা। এই কারণেই কিচেনের কাজের পাশাপাশি বাংলা ভাষায় কুলিনারি শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। নতুন শেফ ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করছি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক খাবার, খাদ্যসংস্কৃতি ও রেসিপি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। একটি বিস্তৃত কুলিনারি বই নিয়েও কাজ করছি।
আমার কাছে এটি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরির বিষয় নয়। এটি দেশের খাবারের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে করা কাজ। আমি বিশ্বাস করি, একজন শেফ শুধু সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করেন না। তিনি একটি হারিয়ে যেতে বসা রেসিপি সংরক্ষণ করতে পারেন। নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন এবং একটি দেশের খাদ্যপরিচয়কে আরও শক্তিশালী করতে পারেন।
আমার স্বপ্ন একটাই—একদিন পৃথিবীর বড় বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কুলিনারি ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশি কুইজিন সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। হয়তো সেই দিনে আমার নাম কেউ মনে রাখবে না। কিন্তু পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যদি একজন বিদেশি শেফ গর্ব করে বলেন, ‘আজ আমি একটি বাংলাদেশি খাবার রান্না করছি।’ তাহলে আমি মনে করব আমার দীর্ঘ পথচলা সার্থক হয়েছে।
কারণ এটি শুধু একজন শেফের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের খাবারের পরিচয়কে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গল্প।



