সময়টা ২০১০ সালের এদিক–ওদিক হবে হয়তো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঢোকার পরও প্রায় কয়েক বছর পার হয়েছে। মধ্য গগনও বলা যায়। হুট করে এক ক্লাস ছুটির দিনে জানা গেল প্রতুল মুখোপাধ্যায় এসেছেন দেশে। গাইবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে। ছুটির দিনটার অবসর ভেঙে সেখানে যাওয়া, না যাওয়ার দোলাচল ভুগিয়েছিল বেশ।
সত্যি কথা বলতে, প্রতুল মুখোপাধ্যায় বা তাঁর গান সম্পর্কে তখনও জানাশোনা বেশ কম। সবচেয়ে জনপ্রিয় যে তথ্যটি মনে গেঁথে ছিল, সেটি হলো, তিনি ‘আমি বাংলায় গান গাই’–এর আসল গায়েন। এর আগে মাহমুদুজ্জামান বাবু’র কন্ঠে এই গান শুনে প্রায় আত্মস্থ করে ফেলেছি বটে। একদিন জানা হলো, প্রকৃত গায়েন প্রতুল। এই অজ্ঞতাপ্রসূত গ্লানি বেশ খোঁচা দিচ্ছিল। শেষে মনে হলো, এই গ্লানিটুকু ঝেড়ে ফেলার জন্য হলেও টিএসসি’তে যাওয়া প্রয়োজন।
তাই সকালের দিকেই যাওয়া হয়েছিল টিএসসি। সেখানে কিছু গুলতানি মেরে এক পর্যায়ে ঢোকা হয়েছিল অডিটোরিয়ামে। সেদিন গ্লানি মেটাতে গান শুনতে গিয়ে শেষে এক অভিনব ভাবনা ও সংকল্প মনে এঁকে বের হওয়া হয়েছিল। প্রতুল এমনভাবেই প্রভাবিত করেছিলেন যে, দুই থেকে তিন ঘন্টা পর অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে আবাসিক হলে যাওয়ার পথেই ঠিক হয়েছিল, জীবনে আর যাই হোক—কান্না আর স্বপ্ন দাঁড়িপাল্লায় তোলা হবে না!
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই দুনিয়ায় মানুষ আসলে পণ্যই। বাংলাদেশের মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অনেকটাই সেই পণ্য হিসেবে গড়ে ওঠার কাল। আবার এই সময়টাতেই নানা চিন্তা, নানা ভাবনা হৃদয়ঙ্গম হয়। আর কিঞ্চিৎ ভাবতে শেখার অভ্যাস গড়লে তো আরও বিপদ। সমাজের গড়ে তোলা ছাঁচ তখন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। একদিকে বাজারের জন্য তৈরি হওয়ার তাড়না থাকে। অন্যদিকে প্রবল হয়ে ওঠে সব ভেঙেচুরে নতুন কিছু গড়ার ইচ্ছা। অন্তত নিজের ছাঁচ বদলের ভাবনা তো হয়ই। এসবের মধ্যেই আবার উঁকি দেয় বিষণ্ণতা। তারুণ্যের ধর্মই এটা। ভাঙা–গড়ার খেলায় বিষণ্ণতা তো থাকেই।
এমন একটা তুমুল সময়েই প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা, জানাশোনা। না, না, প্রত্যক্ষ কোনো সংযোগ হয়নি। যোগাযোগ পুরোটাই হয়েছে গানে গানে। সেদিন সকালে টিএসসি অডিটোরিয়ামে একে একে শুনিয়েছিলেন অনেকগুলো গান। অডিটোরিয়াম ভর্তি মানুষ, বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। মজার বিষয়, গান শুরুর পর সবাই একেবারে নীরব হয়ে গিয়েছিল। পিন পড়লেও শোনা যাওয়ার মতো সেই নীরবতা। আর তা ভাঙছিলেন একজনই, তিনি প্রতুল।
ভিডিও দেখুন:প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের বয়স তখন সত্তরের নিকটবর্তী প্রায়। প্রথমটায় মনে হয়েছিল, এ কেমন গায়েন! তেমন কোনো বাদ্য নেই, আয়োজন নেই। অথচ মাইক্রোফোনে গান শুরুর পর, সেসব অভাববোধ কোথায় নাই হয়ে গেল! একটু হাততালি, একটা তুড়ি—মনে হলো গানে এর চেয়ে ভালো অনুষঙ্গ আর কী হবে! গানের সাথে সাথে চলছিল তাঁর টুকরো টুকরো কথা। সেগুলো যেন আরও মোহাবিষ্ট করে দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে গেয়েছিলেন ‘আলু বেচো, ছোলা বেচো’। শুরুটায় সাধারণ ভঙ্গি। কিন্তু যখনই গলা চড়িয়ে জানালেন, ‘…বুকের জ্বালা বুকেই জ্বলুক, কান্না বেচো না…’, মনের এক কোণায় জড়োসড়ো হয়ে থাকা সব অভিমান আর বিষাদেরা যেন হুড়মুড় করে চোখের কোণে এসে ভিড় জমালো। তবে কি এই কান্না’র আসল রূপ বুঝতে পেরেছে কেউ? তা না চিনলে তো কেউ এভাবে বলতে পারে না। দুনিয়াতে তবে কান্না বোঝার মানুষও আছে!
গানের মধ্যে এর কিছু পরই প্রতুলের আহ্বান ছিল, ‘…বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচো না…’। ঠিক যেন একজন প্রবল মমতায় চোখের জল মুছিয়ে, ভেঙে পড়া একটা মানুষকে আবার দাঁড় করিয়ে কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে বলছেন! আর মনে করিয়ে দিচ্ছেন বার বার, যত যাই ঘটুক, কান্না আর স্বপ্ন বেচো না। দাঁড়িপাল্লায় হয়তো উঠবে সবই। কিন্তু হাতের কলমটা নাহয় দুখের স্মৃতি হয়ে বুকপকেটেই থাকুক। ওরও যে যাওয়ার জায়গা নেই!
প্রতুল মুখোপাধ্যায় গণমানুষের জন্যই গান গেয়েছেন আজীবন। বাণিজ্য সেখানে ঢুকতে পারেনি সেভাবে। গণসঙ্গীতই গেয়েছেন প্রতুল, তবে একা একাই। কারণ তাঁর হাতের কলমকে তিনি কখনো বেচে দেননি। কেউ কিনতেও পারেনি। সেই কলমটা বুকপকেটে নিয়েই প্রতুল মুখোপাধ্যায় আজ চলে গেলেন। তবে গানগুলো অবশ্য অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। হয়তো এই গানগুলোই অন্য কোনোদিন অন্য কাউকে উঠে দাঁড়াতে বলবে। বলবে, ‘তোমার কান্নাও অনেক দামী, ওটি বাজারে তুলো না।’
ধন্যবাদ, প্রতুল মুখোপাধ্যায়।
শুধু আপনার জন্যই আজতক নীলচে কান্না আর লালচে স্বপ্নগুলো এখনো মনের সিন্দুকে সযতনে সংরক্ষণ করে রাখতে পারছি বলে। কেউ কিনতে চাইলেও বলতে পারছি—‘কান্না আর স্বপ্ন বিক্রয়ের জন্য নহে!’
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


প্রতুল মুখোপাধ্যায় আর নেই
