সন্দেহজনক মাদকের অভিযোগে রাশিয়ায় আটক ছিলেন মার্কিন নাগরিক মার্ক ফোগেল। গত সপ্তাহে তাঁকে মুক্তি দিয়েছে পুতিনের প্রশাসন। স্বভাবতই এ কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেজাজ ফুরফুরে। এই ফুসরতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ দেওয়ার অজুহাতে বেশ লম্বা সময় ধরে টেলিফোনে কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই দুই বিশ্বনেতার সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। এর প্রভাব হয়তো ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরেও পড়বে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউক্রেনবিষয়ক সিদ্ধান্তেও ট্রাম্পের হাতে জয় তুলে দিতে প্রস্তুত আছেন পুতিন। বস্তুত তিনিই ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং এখন যদি ইউক্রেন কিছু শর্ত পূরণে রাজি হয়, তাহলে পুতিন হয়তো তৎক্ষণাৎ এই যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে মস্কোর ক্ষমতায় রয়েছেন পুতিন। এই দীর্ঘ সময়ের বেশির ভাগ সময়েই তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ, সোমালি জলদস্যু, কোভিড–১৯ ও জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলার মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে।’
পুতিন বিশ্বাস করেন, এই কাজগুলো করার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শিক যত বাধা রয়েছে, তা দূর হবে। ১৯৪০–এর দশকে স্ট্যালিন ও রুজভেল্ট মিলে যেমনটা করতে পরেছিলেন।
পুতিনের এই বিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপটি গুরুত্বপূর্ণ। এই ফোনালাপ সম্পর্কে জানেন এমন সূত্রগুলো বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধকে দুই দেশেরই ‘কমন’ সমস্যা হিসেবে দেখিয়েছেন পুতিন। তিনি ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন, এটি একটি নির্মূলযোগ্য সমস্যা।
অন্যদিকে ট্রাম্পও এমন নরোম সুরে কথা বলেছেন, যা তাঁর স্বভাবসূলভব উদ্ধত আচরণের সঙ্গে যায় না। সূত্রগুলো বলছে, তিনি পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের সময় একটিও দ্বান্দ্বিক কথা বলেননি। দীর্ঘ সময়ের ফোনালাপটি ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ।
ট্রাম্প পরে তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমরা ইউক্রেন নিয়ে আলোচনা করেছি।’ এটি অবশ্য অনুমেয়ই ছিল। কারণ ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারের শুরুর সময় থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্য থেকে সহজেই বোঝা যায়, তিনি রাশিয়া কিংবা পুতিনকে অতটা আগ্রাসী মনে করেন না। তিনি মনে করেন, ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই দেশকে বিশ্বব্যাপী সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজন। পুতিন নিজেও এটি বোঝেন। তাই তিনি মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট সমাধানের আলোচনায় নিজেকে যুক্ত করেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) একসঙ্গে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এই মহান ইতিহাসই হয়তো ওয়াশিংটন ও মস্কোকে ইউক্রেন সম্পর্কে সরাসরি কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের তথ্যসচিব দিমিত্রি পেশকভ সম্প্রতি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শিগগিরই রাশিয়া সফর করবেন।’ এ বিষয়টিকেও পুতিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি স্বৈরশাসকের দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের অর্থ হচ্ছে, দেশটির স্বৈরশাসনের আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়া। কূটনৈতিক সঙ্কট দূর করার এটি একটি জাদুকরী কৌশল।
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৯ মে মস্কো সফরে যেতে পারেন ট্রাম্প। ওই দিন রাশিয়ায় সরকারি ছুটির দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয়ের স্মরণে রাশিয়া এ দিনটি পালন করে থাকে। ট্রাম্পের ওই সফরের সময়েই ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প এর আগে বিভিন্ন বক্তৃতায় একাধিকবার বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে ইউক্রেনে যুদ্ধ বাঁধত না, এত লাখ লাখ মানুষও মারা যেত না। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, ইউক্রেনে যুদ্ধ বাঁধার জন্য পুতিন দায়ী নন, দায়ী আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট (তৎকালীন) জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টর চেয়ারে বাইডেন না থেকে যদি ট্রাম্প থাকতেন, তাহলে এই যুদ্ধ বাঁধত না।
এ ছাড়া ট্রাম্প মূলত পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে দায়মুক্তি দিতে চান। পাশাপাশি তিনি পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখাতে চান এবং শান্তির পক্ষের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
ট্রাম্প যেকোনো শর্তে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী। ক্রেমলিনও তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। পুতিনও ট্রাম্পের কথায় এখন পর্যন্ত সায় দিয়ে যাচ্ছেন। যেমন ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপি, ইউক্রেনে যুদ্ধ থামানো, জেলেনস্কির আমেরিকাকে প্রতারণা ইত্যাদি সংক্রান্ত যত বক্তব্য দিয়েছেন, সব বক্তব্যে সমর্থন দিয়েছেন পুতিন। অন্তত প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যানমূলক কোনো বক্তব্য পুতিনের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।
শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে পুতিন রাশিয়ার কারাগারে বন্দী থাকা একজন মার্কিনিকে মুক্তিও দিয়েছেন। এর মাধ্যমে পুতিন এই বার্তা দিতে চাচ্ছেন যে, তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত।
তথ্যসূত্র: কার্নেগি এনডাউমেন্ট, রয়টার্স, বিবিসি ও আল জাজিরা



