ছাএ–মাএ নিয়ে যেভাবে বাংলা বাঁচে!

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৫, ০৫:২৬ পিএম
ভাষার মাস চলছে। ফি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসটা আমাদের দেশে বাংলা ভাষা কিছুটা আদরেই থাকে। হঠাৎ করেই বাংলা নিয়ে নানা সচেতনতা দেখা যায়। বড় বড় কোম্পানিগুলো পারলে টিভিসি বানায়। মহা আয়োজনে বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলা আয়োজন করে। তবে এত কিছুর পরও ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনগুলো যখন চলে আসে, তখন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে কেন জানি এক প্রকট হতাশা এসেই ভর করে মনে!
 
এর কারণ নানাবিধ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জীবন দিয়ে বাংলা ভাষার যে মর্যাদা আদায় করে নিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং আজকের বাংলাদেশের মানুষ, সেই মর্যাদা রাষ্ট্রের উন্মেষের পরও পুরোপুরি ধরে রাখা যায়নি। ধরে রাখার বদলে উল্টো বাংলার মর্যাদা নিচের দিকেই নেমেছে।

বাংলা চর্চা আসলে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ঢুকে গেছে, দেশজুড়েই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ব্যবহার বেশি হওয়ার সাথে সাথে যেন আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ছে বাংলার প্রতি বাঙালিদেরই মনযোগহীনতা। এটি যেমন সরকারিভাবে আছে, তেমনি বেসরকারিভাবে আছে, আছে ব্যক্তিগতভাবেও। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলা ভাষাকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে সরিয়ে নেটিভ ইংলিশ বলার তুমুল আগ্রহের অবদান আছে। একইসাথে বাংলার নানাবিধ দূষণও দায়ী।

আরও পড়ুন:
 বাংলা ভাষার এই দূষণ বাংলাদেশের মানুষেরাই করছে। শুধু যদি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই একটু খেয়াল করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ ‘ছাত্র’ শব্দটিই ঠিকঠাক লিখতে পারে না। এমনকি সত্যিকারের ছাত্ররাও না। লেখা হয়, ‘ছাএ’। একইভাবে বহুল প্রচলিত হয়, ‘মাএ’। এখানে স্রেফ উদাহরণ হিসেবে দুটি ভুলের উল্লেখ করা হলো। এমন আরও অনেক ভুল আছে। সব উল্লেখ করতে গেলে এ লেখায় পোষাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, এত ভুল আমাদের হয় কেন? প্রযুক্তিগত সমস্যা এখানে নেই এখন আর। মূল কারণ তাই জানার অভাবই। এমন অভাবের সৃষ্টি হয় প্রাত্যহিক জীবনে বাংলার সঠিক ব্যবহার ও চর্চাহীনতায়।সঠিক ব্যবহার ও চর্চার অভাব হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাকে উপযুক্ত সম্মান দেওয়ার অনিচ্ছা অনেকাংশে দায়ী। বাংলাদেশের শহুরে সমাজ বাংলার এক ধরনের অপভ্রংশ রূপ এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে। একবিংশ শতকে এ দেশের অন্যতম সৃষ্টি এটি। অনেকে অবশ্য অনাসৃষ্টিও বলে থাকেন। তবে নিন্দুকদের সেই মন্তব্যকে একটু পাশ কাটিয়ে যদি দেখা হয়, তবে বলতে হয়, শহুরে সংস্কৃতি নানা ভাষার শব্দের সমন্বয়ে একটি ভিন্ন বাংলা তৈরি করেছে আসলে। এমনটা হতেই পারে। ভাষার বিবর্তন হবে না, তা তো নয়। তবে সেটি শব্দ ও বাক্যের সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে হচ্ছে কিনা, সেটি বিবেচনার বিষয়। দুঃখজনকভাবে, ওই প্রক্রিয়ায় ঘাটতি আছেই। সঠিকতার বদলে আমরা নজরকাড়া পরিবর্তনকে বেছে নিয়েছি। চমক আমাদের মূল লক্ষ্য। এ কারণেই বাংলার সহজ–সুন্দর রূপ তৈরির পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে একটি জগাখিচুড়ি।

প্রতীকী ছবি
যদি রাস্তাঘাটে বিভিন্ন দোকান বা প্রতিষ্ঠানের নামও খেয়াল করা যায়, দেখা যাবে যে, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার প্রভাব সেখানে লক্ষ্যণীয়। এ সমাজে এমন একটি ধারণা চালু হয়ে গেছে যে, ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজিই পাতে তোলার বিষয়। এটি যে কেবলই ঔপনিবেশিক শাসনের কারণেই হয়েছে, তা এখন আর বোধ হয় না। মাতৃভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টাই আসলে আমাদের নেই। তাই শুদ্ধভাবে বাংলা বলাটা সামাজিকভাবেও এখানে অতটা জরুরি বলে বিবেচিত হয় না। বরং, ইংরেজি ভাষা এ ক্ষেত্রে যোজন যোজন এগিয়ে গেছে। সামাজিক, পেশাগত, শিক্ষাগত প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে ইংরেজি জানাটাই মূখ্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেটা যে কেবলই আন্তর্জাতিক ভাষা বলে, তা নয়। নিজের মাতৃভাষাকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হলে আসলে মৌলিক উন্নতিও লাগে। চীন, জাপান বা কোরিয়া এভাবেই মান্ডারিন, জাপানিজ বা কোরীয় ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর মানে এই নয় যে, ইংরেজিকে বর্জন করে তা করতে হবে। কিন্তু আমরা জাতিগতভাবেই ‘ডিলারশিপ’ ধারণায় মজে গেছি। তাই অন্যের সম্পদের ডিলার হয়েই আমরা এগোনোর চেষ্টা করি কেবল। এতে কষ্টও কম আসলে। ওটিই হয়তো আমাদের এমনতর হওয়ার প্রধান কারণ।
অবশ্য ইংরেজিও যে আমরা খুব শুদ্ধ বলতে পারি, তা কিন্তু নয়। কেবল কম্যুনিকেটিভ ইংলিশই তো শেষ কথা নয়। প্রয়োজন ভাষার ওপরে দখল। ওখানেই আমরা বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই পিছিয়ে। আমাদের কেবল চটক আছে, দেখনদারি আছে। অনেকটা বাইরে দিয়ে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট অবস্থা আর কি!

আরও পড়ুন:
 এর প্রধান কার্যকারণ হিসেবে আনা যায়, আমাদের গভীরে প্রবেশের অনীহাকে। যেকোনো কিছুরই গভীরে যেতে হলে কষ্ট আছে। বই পড়তে হয়, পড়াশোনাটাও উপরে উপরে খালি করলে চলে না। কিন্তু বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলার অবস্থাই যদি দেখি, তাহলে জানা যাবে, এমন রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মেলাতেই মানুষ বই কেনে না। মানুষ বইমেলায় ঘুরতে যাচ্ছে, সেলফি তুলছে, ফুচকা খাচ্ছে, কিন্তু বইয়ের দিকে দৃষ্টিপাত—নৈব নৈব চ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরেই জানা যাচ্ছে যে, এবারের বইমেলাতেও নাকি বইয়ের বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ, এমনকি গতবারের চেয়েও। প্রতিবারই অবশ্য আগেরবারের চেয়ে বাজে অবস্থার কথা শোনা যায়। পরিচিত প্রকাশকেরাও বলছেন, বইয়ের বিক্রি কেবলই নিচে নামছে। তবে তাই বলে বইমেলায় মানুষের ভিড় যে হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। সেই ভিড় কেবলই সময়যাপনের, বই নয়।

যেখানে জাতিগতভাবেই আমাদের ধরন হয়ে যাচ্ছে এমন, সেখানে উন্নতির আশা খোঁজা বৃথা। পরিবর্তন আনতে হলে সরকারি, বেসরকারি ও বেশি করে ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রয়োজন, উপলব্ধি প্রয়োজন। ব্যক্তিই যদি ঠিক না হয়, তবে আর সমষ্টিগত পরিবর্তন আসবে কীভাবে? রাষ্ট্রীয় অঙ্গনেই বা উন্নতি কীভাবে আসবে?
 
আরও পড়ুন:
চলুন, বরং একটু নিজেদের দিকে তাকাই। বাংলা ভাষাটা মায়ের মাধ্যমেই আমাদের মুখে ফোটে তো। মায়ের কথা ভেবেই নাহয় ‘মাএ’, ‘ছাএ’ থেকে একটু বের হই। কী বলেন?

লেখক:
উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
সংগীতের যেমন নিজস্ব সুর ও তালের স্থাপত্য আছে, আবৃত্তিরও তেমনি শব্দ ও নৈশব্দের নিজস্ব পরিমিতি ও কণ্ঠশৈলীর কারুকাজ আছে, যা একে অন্য যেকোনো পারফর্মিং আর্ট থেকে এক অনন্য উচ্চতা ও স্বকীয় মর্যাদা প্রদান...
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি...
আজ ১৮ আগস্ট, বাংলা নাটকের অনির্বাণ দীপশিখা সেলিম আল দীনের ৭৬তম জন্মজয়ন্তী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনীর সোনাগাজীতে জন্ম নেওয়া এই মহান নাট্যকার শুধু নাটকের ভাষা ও আঙ্গিকই পাল্টে দেননি, বাঙালির...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
পাবনা মানসিক হাসপাতাল এলাকায় ঠাকুর শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র ও মাতৃ মন্দির রক্ষার দাবি জানিয়েছে সৎসঙ্গ বাংলাদেশ। সম্প্রতি পাবনা মানসিক হাসপাতালের সম্প্রসারণ...
লন্ডনের মাটিতে লাল-সবুজের আরও একটি গর্বের পতাকা উড়ল। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লন্ডনের মেইজব্রুক ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার...
পূর্ববিরোধের জেরে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার জগৎকুড়া ও গোপালপুর উপজেলার গোলপেঁচা গ্রামের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে কালাম তালুকদার (৬৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়ি ‘চুনকা কুটির’-এর সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে পুলিশ। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আইভী এই বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
লোডিং...

এলাকার খবর