ভাষার জন্য এ ভূখণ্ডের মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করতে হয়েছে। ভারত ভাগের পরে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষাভাষীদের নতুন জাতি রাষ্ট্র গঠনের বাঁক পরিবর্তনের আন্দোলন। সে সময়ে নারীদের স্বাধীনতা ছিল না বললেই চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। তাদের ছেলে সহপাঠীদের সাথে কথা বলা নিষেধ ছিল। ক্লাস শেষে সময় কাটাতে হতো কমনরুমে। শিক্ষক কমনরুম থেকে ডেকে মেয়েদের ক্লাসে নিয়ে যেতেন এবং ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে শিক্ষকের সাথেই বেরিয়ে আসতে হতো। এ রকম একটি রক্ষণশীল সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ কোনো সামান্য ব্যাপার ছিল না। ভাষা আন্দোলন শুরুর সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮০-৮৫ জন।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রীরা। পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলগুলোতে নারীরা ছিলেন সামনের কাতারে। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবি বিষয়ে বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত পোস্টার লিখেছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারীরাই পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ব্যারিকেড ভাঙেন। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা সংগ্রহ করেন।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখেন মেয়েরা। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য গৃহিণীরা অলঙ্কার খুলে দেন। শুধু তাই নয়, ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার জন্য অনেক নারীকে জেল খাটতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন সংসার, কেউবা বহিষ্কৃত হয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। শুধু ঢাকা নয়, রাজশাহী, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রায় সবকটি বড় শহরের সচেতন প্রগতিশীল নারী ও ছাত্রীরা যুক্ত হয়েছিলেন এই আন্দোলনে। নারীদের কী অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ়তা থাকলে, এভাবে একটি আন্দোলনে যোগ দেওয়া সম্ভব, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।’ আন্দোলন শুরুর দিকে একজন ছাত্রীর মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মনে উদ্দীপনা জোগাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দুন মজলিশ গঠিত হয়। সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখা। তমুদ্দুন মজলিশ গঠিত হবার পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। এই পুস্তিকা তখনকার বাংলা ভাষাভাষী সচেতন জনগোষ্ঠীর মনে ভাষা নিয়ে ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। ভাষাসৈনিক অধ্যাপক চেমন আরা ভাষা আন্দোলন বিষয়ক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন–‘আমি ও আমার ছোট বোন মমতাজ তমুদ্দুন মজলিসের কর্মী হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে আমরা মজলিশ অফিসে যেতাম। পোস্টার, ব্যানার বানানোসহ আরও অনেক কাজে আমরা বড়দের সাহায্য করতাম। এ সময়ে জেবুন্নিসা বেগম, দৌলতুন্নেছা বেগম ও আনোয়ারা বেগমকে মজলিসে আসতে দেখতাম। তারা তিনজনই উচ্চশিক্ষিত এবং মজলিসের আদর্শে বিশ্বাসী ও ভাষার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।’ বিভিন্ন শহরে তখন মজলিসের শাখা গঠিত হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উইমেন হলের ছাত্রীরা দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় ড. শাফিয়া খাতুন ছিলেন উইমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সহসভাপতি। ১৯৫০-৫১ তে তিনি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের উইমেন হল ইউনিয়নের জিএস এবং পরবর্তী বছর ভিপি নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলন সংঘটিত করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনে যারা অবশ্যই স্মরণীয়, তাঁরা হলেন–সুফিয়া খাতুন, সামসুন নাহার, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, কাজী আমিনা, মাহফিল আরা, খোরশেদী খানম, হালিমা খাতুন, রানু মুখার্জী, আফসারী খানম প্রমুখ। এসব মহীয়সী নারী একুশের আন্দোলনকে বেগবান করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার ক্ষেত্রে বিতর্ক উঠলে সেদিন ছাত্রীরা পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে মেয়েরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমতলার সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন। পুলিশি হামলার আশঙ্কায় ছাত্রীদের মিছিল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিছিলে নারীরা হেঁটেছিলেন, ছিলেন অগ্রবাহিনী হিসেবে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে নৃশংসতার প্রতিবাদে অভয় দাশ লেনে মিছিলের নেতৃত্ব দেন বেগম সুফিয়া কামাল ও নুরজাহান মুরশিদ। ধর্মঘট উপলক্ষে প্রচুর পোস্টার ও ব্যানার লেখার দায়িত্ব পালন করেন ড. সাফিয়া খাতুন ও নাদিরা চৌধুরী।
ঢাকার বাইরে নারীরা ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে মমতাজ বেগম কারাভোগ করেন। শুধু তাই নয় সরকারের চাপে স্বামী তাঁকে তালাক দিতে বাধ্য হন। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, রেনু ধর ও শাবানীর মতো কিশোরীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ময়মনসিংহ মুসলিম স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাহেলা বেগম ভাষা শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করায় সরকারের চাপে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করে। সালেহা বেগমের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে।
২২ ফেব্রুয়ারির গায়েবানা জানাজা, শোক মিছিল ও ২৩ ফেব্রুয়ারি হরতালসহ প্রতিটি কর্মসূচিতে নারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার গড়ে তোলেন। আর বর্তমানে যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সেই নকশার সঙ্গে মিশে আছে শিল্পী নভেরা আহমেদের নাম। ভাষার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার পরিণতি লাভ করতে লেগেছিল প্রায় এক দশক। ১৯৫২ সালের শহীদী আত্মদান পাকিস্তানিদের থমকে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ষড়যন্ত্র থেকে তারা পিছু হটেনি। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ বেদিতে এ দেশের ছাত্রসমাজ যাতে শ্রদ্ধা জানাতে না পারে, সে জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। সেদিন ঘটে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ছাত্রদের সাথে সাথে ছাত্রীরাও ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নেমে এলে প্রায় ২০-২১ জন ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সরকারের টনক নড়ে। পরের বছর; অর্থাৎ, ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার আন্দোলন এখানেই শেষ নয়। ১৯৬১ সালে ভারতের আসামের শিলচরে বাংলাভাষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হয় ভারতীয় ছাত্রী কমলা ভট্টাচার্যকে। কমলার জন্ম অবিভক্ত বাংলার সিলেটে ১৯৪৫ সালে। ১৯৫০ সালে পরিবারের সঙ্গে কমলা পশ্চিমবঙ্গ হয়ে আসামের শিলচরে চলে যান। বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমতা তাঁকে রাজপথের আন্দোলনে নিয়ে আসে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে শিলচরের কাছাড়ে গঠিত হয় ‘কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদ’। সেখানে নেতাদের বক্তৃতা শুনে ভাষা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হন কমলা। ১৯৬১ সালের ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিনে আন্দোলনকারীদের সংকল্প দিবসে কমলাও অংশগ্রহণ করেন, শপথ নেন মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার। ১৯ মে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। স্থানীয় সত্যাগ্রহ আন্দোলনের নেত্রী জ্যোৎস্না চন্দের ডাকে ২০-২২ জন নারীর দলে যোগ দেন কমলা। আন্দোলনরত সকলে যখন স্লোগান দিচ্ছিল ‘বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ তখন ভারতীয় পুলিশ বাহিনী বিনা প্ররোচনায় ছাত্র‑জনতাকে উদ্দেশ্য করে ১৭ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। মুহূর্তে কমলাসহ ১১টি তাজা প্রাণ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কমলাসহ সেই ১১ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় সরকার।
এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন–
‘বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।’
এই সময় আর সেই সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন নারীদের পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে অভিভাবকের অনুমতির প্রয়োজন হতো। গ্রামের নারীরা ছিল পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি। এমন সময়ে সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে নারীদের বেরিয়ে আসা কোনো সাধারণ ব্যাপার ছিল না। ছাত্রদের ক্ষেত্রে যেখানে পুলিশি বাধা ছাড়া অন্য কোনো বাধা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি নারীরা এই ভূখণ্ডে আজকের অবস্থানে এসেছেন। এত কিছু সত্ত্বেও আজও পর্যন্ত নারী ভাষা সংগ্রামীদের নাম ও তাদের অবদান নিয়ে ইতিহাসে খুব কম আলোচনা হয়েছে। এ দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারক-বাহক বা দেশের ইতিহাসবিদ অথবা বুদ্ধিজীবীরা কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না।
ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস সঠিকভাবে জানা ও তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো আজ আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তা যদি আমরা করতে পারি, তবেই আমাদের আগামী প্রজন্ম তাদের বোনেদের কীর্তিগাঁথা শুনে গৌরব বোধ করবে। আগামী দিনে যেকোনো অন্যায়-অনিয়ম ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিজেদের প্রস্তুত করতে উদ্দীপ্ত হবে।
লেখক: লেখক ও অধিকার কর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাষ্ট্রের ভাষা হোক
ভাষিক জাতীয়তার সংকট
একুশে ফেব্রুয়ারি: বিভাজনটা ছিল আলোর সঙ্গে অন্ধকারের
