অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে দিন দিন বিভিন্ন রোগ বেড়েই চলেছে। এসব রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। বেশিরভাগ মানুষের ধারণা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। কিন্তু শিশু-কিশোরদেরও ডায়াবেটিস হতে পারে, যা জুভেনাইল ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে শরীরের অগ্নাশয়ে ইনসুলিন তৈরি হয় না বলে চিকিৎসা হিসেবে ইনসুলিন দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরা টাইপ ওয়ান-এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আজকাল শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসও দ্রুত বাড়ছে। শিশুর শরীরে ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং শরীরে ইনসুলিনের আপেক্ষিক ঘাটতি হওয়ার ফলে রক্তে শর্করার আধিক্য দেখা দেয়।
যেহেতু ডায়াবেটিসের ফলে রক্তে শর্করা বেড়ে যায়। আর দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থেকে হার্ট, কিডনি, চোখসহ অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হতে থাকে, যা খুবই বিপজ্জনক। এই অবস্থায় শিশুদের স্বাস্থ্যের সঠিক যত্ন নিলে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব। ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের স্বাভাবিক বাচ্চাদের থেকে চিকিৎসা ও খাদ্য দুক্ষেত্রেই বেশি যত্ন নিতে হবে, যাতে কোনোভাবেই তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুরা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার ব্যাপারে কম আগ্রহী। তাই তাদের খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করতে হবে এবং খাবার আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে হবে।
কম বয়সের রোগীদের রক্তে সুগার হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এতে ওজন দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং এ রোগীদের মধ্যে কিটোঅ্যাসিডোসিস প্রবণতা দেখা দেয়। এ জন্য এদের খাবার থেকে চিনি-গুড়–মধু বাদ দিয়ে পরিমিত জটিল শর্করা জাতীয় খাবার রাখতে হবে। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১ দশমিক শূন্য গ্রাম প্রোটিন রাখা জরুরি এবং খাবারে কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত চর্বি কমানো খুব একটা প্রয়োজন নেই।
এছাড়া এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে খাবার ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অবশ্য মনে চলতেই হবে। যেমন:
১. প্রতিদিন একই সময়ে খাবার গ্রহণ করা জরুরি। এতে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
২. সকালের খাবার হল দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার, তাই ভুলেও শিশুদের সকালে খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। সকালে খাবার না খেলে স্থূলতা বাড়তে পারে। ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। তাই শিশুদের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ব্রেকফাস্টের অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে সারাদিন তাদের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
৩. শিশুদের খাবার তার বয়স ওজন উচ্চতা ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। বড়দের সমপরিমাণ খাবার শিশুদের প্রয়োজন নাই। কারণ শিশুর খাবারের চাহিদা তথা পাকস্থলীর সক্ষমতা বড়দের তুলনায় কম।
৪. বেশিরভাগ শিশুরা বাইরের খাবার পছন্দ করে। কিন্তু জন্মগতভাবে তারা কিন্তু বাইরের খাবার চিনে না। তাই শিশুদের বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার না দিয়ে বরং ঘরের তৈরি সাধারণ খাবারে অভ্যস্ত করুন। এমনকি বাসায় তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত টিফিনের অভ্যাস করাটাও জরুরি।
৫. ডায়াবেটিস রোগীদের মত শিশুদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসিনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই জেগে থাকলে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর অবশ্যই খাবার খেতে হবে।
৬. শিশুদের প্রতিদিন নিয়মিত অন্তত এক ঘণ্টা খেলাধুলা বা ব্যায়াম করতে দিতে হবে। যদিও বর্তমান সময়ে শিশুরা শারীরিক পরিশ্রম বা বাইরে খেলাধুলা কোনোটাই করতে চায় না বা অনেকের ক্ষেত্রে সুযোগও থাকে না। এতে রক্তে শর্করা যেমন কমানো যায় না, তেমনি ওজন বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
৭. যদিও চিনি, গুড়, মধু, মিষ্টি ইত্যাদি খাওয়া নিষেধ থাকলেও উৎসব বা অনুষ্ঠানে মিষ্টি জাতীয় খাবার সামান্য পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল সুইটনার ব্যবহার করা ভালো। অন্যথায় রক্তের সুগার কমানোর জন্য ব্যায়াম বা খেলাধুলার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে এবং ইনসুলিনের পরিমাণ ঠিক করে নিতে হবে। তবে অবশ্যই প্রতিদিনই মিষ্টি খাবার খাওয়া যাবে না।
৮. অবশ্যই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এছাড়া শিশুরা যাতে নিয়মিত সঠিকভাবে খাবার খায় এবং তাদের ব্লাড সুগার লেভেল যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। তাছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য হেলথ চেকআপ করতে হবে।
৯. বেশিরভাগ শিশু এনার্জি বা সুগারযুক্ত পানীয় খুব পছন্দ করে। কিন্তু এতে উচ্চ পরিমাণে সুগার থাকে, যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে আপনি তাজা ফলের রস বা ডাবের পানি পান করাতে পারেন।
১০. কোনোভাবেই শিশুর সারাদিনের খাবারে শর্করার পরিমাণ যাতে বেশি না হয় সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো বেশি জরুরি। প্রয়োজনে শিশুদের পুষ্টিবিদের কাছ থেকে সঠিক খাদ্যতালিকা প্রণয়ন করে নিতে হবে।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি।


ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ
গরমে ডায়াবেটিস রোগীর সতর্কতা
