জন্মশতবর্ষে মহানায়ক উত্তম কুমার। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকী। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি। শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁকে নিয়ে কলম ধরেছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। উত্তম-সুচিত্রার মতো বাঙালি দর্শকের কাছে উত্তম-সাবিত্রী জুটিও ছিল বেশ জনপ্রিয়। শুধু পর্দার জীবনই নয়, বাস্তবেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। এমনকি সাবিত্রীকে উত্তম বিয়ে করেছেন—এমন কথাও প্রচার হয়েছিল! যদিও পুরোটা গুজব আর জল্পনা। আজ মহানায়কের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-এ প্রকাশিত সাবিত্রীর স্মৃতিকথাটি হুবহু তুলে ধরা হলো ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের পাঠকদের জন্য—
মানুষের শরীরের মৃত্যু হলেও, আত্মার মৃত্যু হয় না কখনও। তা না হলে এত বছর পরেও, উত্তম কুমারকে ঘিরে কেন এত লেখালেখি হয় আজও? কেনই-বা এত আলোচনা? তাঁকে মনে আছে বলেই তো সকলে স্মরণ করেন। সত্যি কথা বলতে, এমন একটা দিনও যায় না, যে দিন মানুষের মুখে উত্তম কুমারের নাম একবারও ওঠে না। ৩৬৫ দিনের কোনো না কোনো সময়ে ওঁর কাজ নিয়ে আলোচনা হবেই। অন্তত আমি তো বেঁচে আছি, তাই সত্যিটা জানি। এত বছরে আমি যা যা বলার মানুষটি সম্পর্কে সব বলে দিয়েছি।
আজ শুধু একটা কথাই স্পষ্ট করতে চাই, এমন জুটি আর কখনও তৈরি হবে না। আসলে সত্যি বলতে ইন্ডাস্ট্রিতে আর কখনও কোনো উত্তম কুমার জন্মাবেই না। কেউ বিশ্বাস করুক বা না-ই করুক, এটাই সত্যি। কিছু কিছু মানুষ আছেন, যেমন ছবি বিশ্বাস, প্রভাদেবী—যাঁরা আর জন্মাবেন না। যাঁরা হাসতে হাসতে কাঁদতেন, কাঁদতে কাঁদতে হাসতেন। তাই তাঁদের কোনো বিকল্প হবে না। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁদের দেখেওনি। তবু সব বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, কিছু কিছু সিনেমার মাধ্যমে তাঁরা আজীবন মানুষের মনে থেকে যাবেন।

একটা ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ল, উত্তম কুমারও কিন্তু বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে ‘মহানায়ক’ হয়েছেন। তিনি একটা সময়ে এমপি প্রোডাকশনের সঙ্গে বহু সিনেমা করেছিলেন। তাদের বিরাট স্টুডিও ছিল। যে প্রোডাকশনের সঙ্গে দীর্ঘদিন চুক্তিবদ্ধও ছিলেন উত্তম কুমার। ‘বসু পরিবার’ বলে একটা সিনেমা করেছিল তারা। যে ছবিতে সুপ্রিয়া দেবী, আমিও ছিলাম। এককথায় সুপারহিট হয়েছিল সিনেমাটি। তার আগে উত্তম কুমার অনেক সিনেমা করলেও, একটাও সেভাবে হিট হয়নি। কিন্তু ওই সিনেমায় এমন একটা ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, যেটা অভাবনীয়। তার পরে আর উত্তম কুমারকে কেউ কখনও ধরতে পারেননি।
‘সাবু’ বলে অমন ডাক কত বছর হয়ে গেল শুনিনি। এখনও কিছু কথা মনে পড়লে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে। আমি ওঁর কথা বলতে বলতেই কেঁদে ফেলি। একটা মানুষ একটা মানুষের হৃদয়ে থাকে। একটা সময়ে মনে আছে, সংবাদপত্রে আমাদের নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি হয়েছিল। আজ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবলে আর খারাপ লাগে না। আসলে সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের বিভিন্ন গসিপ জানার জন্য কেউ না খেতে পেলেও ওই সংবাদপত্রটা কিনত। বিশেষ করে শুক্রবার আর রবিবারের সংখ্যাটা। যত সব গোপন কথা আর মিথ্যা ওখানে পাওয়া যেত।
সেই পত্রিকায় একবার প্রকাশিত হয়েছিল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ও উত্তম কুমার বিয়ে করেছেন। একদিন ঘুম থেকে উঠেই খবরটা দেখলাম। এমনভাবে লেখা হয়েছিল যেন ওই সংবাদপত্রের সকলে বিয়েতে উপস্থিত ছিল। এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে যেমনটা হয়, ওঁর (উত্তম কুমার) বাড়িতে তো ভীষণই আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। আমার বাবা কিন্তু একটা প্রশ্নও আমায় করেননি। কারণ, যখন আমি পা রাখি ফিল্মিদুনিয়ায়, তখন বাবা বলেছিলেন, এত দিন ধরে আমরা তোমায় বড় করে দিয়েছি। এবার তোমার জীবনের ভালো-মন্দের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। খারাপ করলে খারাপ ফল, ভালো করলে ভালো ফল পাবে। সেই কথাগুলো মাথায় গেঁথে গিয়েছিল।

ওই খবরের কাগজটা আর সকলের মতো সেদিন আমিও কিনে এনেছিলাম বাড়িতে। পড়ার পরে স্তম্ভিত হয়ে খানিকক্ষণ বসে থেকেছি। তার পরে খালি মনে হতো এই খবরের কাগজের লেখাগুলো যদি সত্যি হতো, কী ভালোই না হতো! আসলে মিথ্যা বলব না, আমারও তো একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। উত্তম কুমার সবসময় বলতেন, ‘তুই তো আমার ছেলের থেকে কয়েক বছরের বড়। আমার হাঁটুর চেয়েও কম বয়স তোর।’
আমাদের বাড়িতে এসে কতদিন জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতেন। আসলে আমার দিদি খুব ভালো রান্না করতেন। উত্তম কুমার বলতেন, ‘সাবু তোর যদি কখনও খুব খারাপ দিন আসে, তুই তাহলে সিনেমা থেকে সরে গেলেও একটা রেস্তোরাঁ খুলিস। দিদির সঙ্গে মিলেমিশে চালাতে পারবি। আয়ও হবে। মানুষ খেয়ে শান্তিও পাবে।’ কত কথা, কত স্মৃতি, সবটাই মনের ভেতরে গেঁথে রয়েছে। যত দিন বাঁচব, এভাবেই একঝাঁক স্মৃতি থেকে যাবে।


সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিনে ‘তারকার মেলা’
ভালো ও নরম মনের মেয়েদের জন্য এই রঙিন জীবন না: বর্ষা
