উন্মোচিত হলো আইফোনের নতুন সিরিজ- আইফোন ১৭। সিরিজের নতুন আকর্ষণ হিসেবে এসেছে আলট্রা স্লিম ডিজাইনের ‘আইফোন এয়ার’ মডেলটি, যেটা আইফোন প্লাসের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অ্যাপলের বার্ষিক শরৎকালীন ইভেন্টে পর্দা উঠেছে আইফোন ১৭ সিরিজের ৪টি মডেলসহ আরও বেশ কয়েকটি অ্যাপল পণ্যের ওপর থেকে পর্দা উঠেছে।
অ্যাপলের কুপার্টিনো সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এ বছরের শরৎকালীন ইভেন্টটিকে আগে থেকেই ‘অ ড্রপিং’ বা বিস্ময়কর নামে অভিহিত করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। নামের প্রতি কতটা সুবিচার করতে পেরেছে অ্যাপলের বহুল-আকাঙ্ক্ষিত এই আয়োজন, চলুন তাহলে সেটাই দেখে নেওয়া যাক।
আইফোন ১৭ সিরিজ
অ্যাপল সদর দপ্তরের স্টিভ জবস সেন্টার থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ইভেন্টে আইফোন ১৭ সিরিজের ৪টি মডেল তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক। নতুন আইফোনের ৪টি মডেল হচ্ছে- আইফোন ১৭ (বেজ মডেল), আইফোন এয়ার, আইফোন ১৭ প্রো এবং আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স।
আইফোন ১৭ বেজ মডেল
আইফোন ১৭ বেজ বা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুটি ফিচার হচ্ছে এর উন্নত ডিসপ্লে ও ক্যামেরা। ফোনটির ৬.৩ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর ডিসপ্লেকে অ্যাপল তাঁদের এযাবৎকালের সেরা বলে জানিয়েছে। ব্যবহারকারীরা এর ডিসপ্লেতে ৩ হাজার নিটস সর্বোচ্চ ব্রাইটনেসের পাশাপাশি উপভোগ করবেন প্রোমোশন অ্যাডাপ্টিভ প্রযুক্তির ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট।
এছাড়া বেজ মডেলে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ডুয়াল ফিউশন রিয়ার ক্যামেরা সিস্টেমের পাশাপাশি থাকছে ১৮ মেগাপিক্সেলের সেন্টার স্টেজ প্রযুক্তির ফ্রন্ট (সেলফি) ক্যামেরা। বেজ মডেলটির দাম শুরু হচ্ছে ৭৯৯ ডলার থেকে। অর্থাৎ, বেজ মডেলটির দাম বাড়ায়নি অ্যাপল।
আইফোন এয়ার
নিঃসন্দেহে নতুন সিরিজের প্রধান আকর্ষণ অতি পাতলা (আলট্রা-স্লিম) ও হালকা ডিজাইনের আইফোন এয়ার মডেল। মাত্র ৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার পুরু এবং ১৬৫ গ্রাম ওজনের এই মডেলটিকে এযাবৎকালের সবচেয়ে পাতলা আইফোন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে অ্যাপল। দেখতে পেন্সিল আকৃতির হলেও এতে আছে ৬.৫ ইঞ্চির ডিসপ্লে এবং অ্যাপলের সাম্প্রতিকতম এ১৯ প্রো চিপ।
উল্লেখ্য, নতুন এই মডেলটিকে অ্যাপল ‘আইফোন এয়ার’ নামে অভিহিত করেছে, ‘আইফোন ১৭ এয়ার’ নয়। আইফোন এয়ারের দাম শুরু হচ্ছে ৯৯৯ মার্কিন ডলার থেকে।
আইফোন ১৭ প্রো ও প্রো ম্যাক্স
আইফোন ১৭ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেল দুটিতে নতুন রঙের সমাহার ঘটিয়েছে অ্যাপল। সিলভার, ডিপ ব্লু এবং কসমিল অরেঞ্জ- এই তিনটি রঙে পাওয়া যাবে ১৭ সিরিজের প্রো ভ্যারিয়েন্ট। দুটি মডেলেই থাকছে উচ্চ-সক্ষমতার এ১৯ প্রো চিপ, যেখানে ৬ কোরের সিপিইউ ও ৬ কোরের জিপিইউ সন্নিবেশিত হয়েছে। এক চার্জে ৩৯ ঘন্টার ভিডিও প্লেব্যাক এবং ২০ মিনিটে ৫০ শতাংশ চার্জিংয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে অ্যাপল।
৩টি ৪৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা থাকছে রিয়ার ক্যামেরা সিস্টেমে। অন্যদিকে ডিভাইসে সেলফি ক্যামেরা হিসেবে পাওয়া যাবে ১৮ মেগাপিক্সেলের সেন্টার স্টেজ ক্যামেরা।
আইফোন ১৭ প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেল দুটির মধ্যে মূল পার্থক্য ডিসপ্লে সাইজ ও স্টোরেজ অপশনে। প্রো মডেলে আছে ৬.৩ ইঞ্চির ডিসপ্লে, যেখানে প্রো ম্যাক্সে পাওয়া যাচ্ছে ৬.৯ ইঞ্চির ডিসপ্লে। প্রো মডেলে সর্বোচ্চ ১টিবি পর্যন্ত স্টোরেজ পাওয়া যাবে, কিন্তু প্রো ম্যাক্স হলেই স্টোরেজ উন্নীত করা যাবে ২টিবি পর্যন্ত।
আইফোন ১৭ প্রো মডেলের দাম শুরু হচ্ছে ১০৯৯ ডলার থেকে। অর্থাৎ গত বছরের তুলুনায় এর দাম ১০০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এর বিনিময়ে ব্যবহারকারীরা ১২৮জিবি’র পরিবর্তে ২৫৬জিবি স্টোরেজ পেতে যাচ্ছেন। তবে প্রো ম্যাক্স মডেলের প্রাথমিক দাম আগের মতোই ১১৯৯ ডলার ধার্য করা হয়েছে।
আইফোনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি শরীরে পরিধানযোগ্য (ওয়্যারেবল) প্রযুক্তি পণ্য উন্মোচন করেছে অ্যাপল। এর মধ্যে আছে অ্যাপল এয়ারপডস প্রো ৩, অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১১, অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩, অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৩, এবং আইওএস ২৬ অপারেটিং সিস্টেম।
এয়ারপডস প্রো ৩
শরৎকালীন ইভেন্টে অ্যাপল নতুন ইয়ারপডস নিয়ে আসবে, এমনটা বেশ প্রত্যাশিতই ছিল। সে হিসেবে গ্রাহকদের নিরাশ করেনি অ্যাপল। উন্মোচিত হয়েছে এয়ারপডস প্রো ৩ মডেল। নতুন এই ইয়ারপডসে আছে ইন-ইয়ার অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন প্রযুক্তি, যার কল্যাণে আগের প্রজন্মের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ শব্দ দূর করতে সক্ষম এয়ারপডস প্রো ৩।
৫টি ভিন্ন ভিন্ন সাইজের- এক্সএক্সএস; এক্সএস; এস; এম; ও এল- ইয়ার টিপ অফার করছে এয়ারপডস প্রো ৩, যেখানে আগের প্রজন্মে অপশন ছিল ৩টি। এছাড়া ব্যায়ামের সময় আরও স্থিতিশীল পারফরম্যান্সের নিশ্চয়তার পাশাপাশি এতে আছে ফিটনেস অ্যাপে হার্ট রেট মনিটর করার সুবিধা।
অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় এয়ারপডস প্রো ৩-তে যুক্ত হয়েছে লাইভ ট্রান্সলেশনের সুবিধা। ফলে ব্যক্তিগত কথোপকথনের সময় রিয়েল টাইমে বিদেশী ভাষা অনুবাদ করার সুবিধা পাবেন ব্যবহারকারীরা। আগের প্রজন্মের এয়ারপডসের মতোই নতুন এয়ারপডস প্রো ৩-এর দামও শুরু হচ্ছে ২৪৯ ডলার থেকে।
অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩
বেশ কিছু আপগ্রেড নিয়ে হাজির হয়েছে অ্যাপলের স্বল্পমূল্যের স্মার্টওয়াচ- অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩। এবারে রিস্ট টেম্পারেচার সেন্সর যুক্ত হওয়ায় ভাইটালস অ্যাপ এবং সাইকেল ট্র্যাকিং অ্যাপের মাধ্যমে ডিভাইসটি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য প্রদান করবে বলে জানা গেছে।
ব্যবহারকারীর শরীরের তাপমাত্রা, হরমোনজনিত পরিবর্তন, হার্ট রেট, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার সম্পর্কিত তথ্য জানাবে ভাইটালস অ্যাপ। অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মেয়েদের মাসিক ঋতুচক্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে সাইকেল ট্র্যাকিং অ্যাপ। এখানেই শেষ নয়।
ব্যবহারকারী কতক্ষণ টানা ঘুমাতে পারেন, ঘুম কতটা গভীর হয়, এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্লিপ স্কোরও প্রদান করবে অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩। এছাড়া ঘুমের সময় ব্যবহারকারীর শ্বাস-প্রশ্বাস সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি-না তাও জানাবে এই স্মার্টওয়াচ। অর্থাৎ, ডিভাইসটি থেকে স্লিপ অ্যাপনিয়া সম্পর্কিত নোটিফিকেশন পাবেন ব্যবহারকারী।
অ্যাপল ওয়াচ এসই ৩ এর প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য ধার্য করা হয়েছে ২৪৯ ডলার, ঠিক যেমনটা ছিল এর আগের প্রজন্মের ডিভাইসে।
অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১১
স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের উন্নত সব ফিচার নিয়ে উন্মোচিত হয়েছে অ্যাপলের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টওয়াচ- অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১১। ইসিজি অ্যাপ থেকে শুরু করে ভাইটালস অ্যাপ, বিভিন্ন ফিচারে সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্মের এই ডিভাইসটি ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম।
এক্ষেত্রে ওয়াচ সিরিজ ১১ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফিচার হচ্ছে- হাইপারটেনশন নোটিফিকেশনস। এর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে নিয়মিত নোটিফিকেশন পাবেন ব্যবহারকারীরা। ফলে হৃদরোগের সুরক্ষায় বেশ কার্যকর হতে পারে অ্যাপলের নতুন এই ডিভাইসটি।
এছাড়া স্লিপ স্কোর ও স্লিপ অ্যাপনিয়া সম্পর্কিত তথ্যও ব্যবহারকারীকে নিয়মিতভাবে জানাবে ডিভাইসটি। ভাইটালস অ্যাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দৈনন্দিন তথ্য যেমন হার্ট রেট, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার ও রিস্ট টেম্পারেচার জানতে পারবেন ব্যবহারকারী।
অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১১ এর ব্যাটারি লাইফ ২৪ ঘন্টায় উন্নীত হয়েছে। অ্যালুমিনিয়াম বডির ডিভাইসে ব্যবহার করা হয়েছে আয়ন-এক্স গ্লাস, যেটা আগের তুলনায় দ্বিগুণ দাগ-প্রতিরোধী। ৫জি ইন্টারনেট কানেকটিভিটিরও সুবিধা থাকছে এতে। এছাড়া ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তির কল্যাণে মাত্র ১৫ মিনিটের চার্জে প্রায় ৮ ঘন্টা সক্রিয় থাকবে ডিভাইসটি। এর বিক্রয়মূল্য শুরু ৩৯৯ ডলার থেকে।
অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৩
অ্যাপলের নতুন প্রজন্মের এই স্পোর্টসওয়াচেও যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু উন্নত ফিচার, যদিও দাম আগের মতোই ৭৯৯ ডলার থেকে শুরু। ব্যায়ামের সময়, দৌড়ানোর গতি, দূরত্ব ইত্যাদি সাধারণ তথ্যের বাইরে দৈনন্দিন ওয়ার্কআউট সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিখুঁতভাবে দিতে সক্ষম এই ডিভাইসটি।
এই যেমন রানিং ফর্ম, বায়োমেকানিক্স, ফিজিওলজিক্যাল ডেটা, এবং ট্রেনিং ও রিকভারি সম্পর্কিত উন্নত সব তথ্য (মেট্রিক্স) পেয়ে যাবেন ব্যবহারকারী। এছাড়া ওয়াচ আলট্রা ৩ ডিভাইসে ব্যবহৃত জিপিএস-কে স্পোর্টস ওয়াচের মধ্যে সেরা বলে দাবি করছে অ্যাপল।
সাধারণ ব্যবহারে এতে ৪২ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যাবে, যেটা যেকোনো অ্যাপল ওয়াচের মধ্যে সর্বোচ্চ। আরও বেশি আলো ও বিস্তৃত অ্যাঙ্গেলের ডিসপ্লের কল্যাণে ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই এটি রিড করতে পারবেন, যা চোখের জন্য অনেক বেশি আরামদায়ক হবে।
এছাড়া স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিরূপণেও দারুনভাবে কার্যকর অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৩। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) ও স্লিপ স্কোর সম্পর্কিত নোটিফিকেশনও প্রদান করবে এটি।
ফাইনাল কাট ক্যামেরা ২.০ এবং আইওএস ২৬
আকর্ষণীয় সব হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি গতকাল দুটি সফটওয়্যার আপডেটও দিয়েছে অ্যাপল। প্রথমত, আইফোনের অপারেটিং সিস্টেম আইওএস-এর নতুন ভার্সন ‘আইওএস ২৬’ আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর (সোমবার) রিলিজ করবে বলে জানিয়েছে অ্যাপল।
দ্বিতীয়ত, ফাইনাল কাট ক্যামেরা ২.০ নিয়ে আসার কথাও জানিয়েছে অ্যাপল। তাঁদের নিজস্ব এই ক্যামেরা অ্যাপের নতুন ভার্সনে আগের তুলনায় এর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আইফোন ১৭ প্রো মডেল দুটিতে ব্যবহার করা যাবে এই অ্যাপটি, যেটি এখন প্রোরেস র এবং জেনলক সাপোর্ট করবে। এর ফলে আইফোন দিয়ে যারা সিনেমা বানাতে ইচ্ছুক তাঁরা রেফারেন্স সিগন্যালসহ নিখুঁত সিনক্রোনাইজেশন করতে পারবেন।
ফাইনাল কাট ক্যামেরা ২.০ এর কল্যাণে সেন্টার স্টেজ ফ্রন্ট ক্যামেরায় ম্যানুয়াল অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারবেন ব্যবহারকারীরা। পাশাপাশি আইপ্যাডের ফাইনাল কাট প্রো’র লাইভ মাল্টিক্যাম ফিচারের সাথেও আইফোনের ফাইনাল কাট ক্যামেরা ২.০ দারুনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
এই আপডেটেড ক্যামেরা অ্যাপটিতে আরও আছে ওপেন গেট রেকর্ডিং, অ্যাপল লগ ২ সাপোর্ট, এবং টাইমকোড অপশন, যার ফলে আইফোন থেকেই সিনেমাটিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।



