বিমানের ভ্রমণ যতই জনপ্রিয় হোক, সময়মতো ফ্লাইট চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়। বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সকে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়। এতে রয়েছে কর্মী সংকট, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, বিমান সরবরাহের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক এয়ারস্পেসের সীমাবদ্ধতা। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সময়মতো পৌঁছে দেওয়া সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় ৩৮.৯ মিলিয়ন ফ্লাইট চলেছে। এই ভিড় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিল হওয়া সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়াম তাদের ‘অন-টাইম পারফরম্যান্স রিভিউ ২০২৫’ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করেছে, এখন সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা কেবল অস্থায়ী সমস্যা নয়, এটি বিমান চলাচলের নতুন নর্ম। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিশ্বের ১২টি বিমানবন্দর এবং এয়ারলাইন্স। যারা ২০২৫ সালে সময়নিষ্ঠতার দিক থেকে সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর (আইএসটি) ২০২৫ সালে প্লাটিনাম বিজয়ী হিসেবে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। বছরে প্রায় ৮৪ মিলিয়ন যাত্রীকে ৩৩০টি গন্তব্যে পরিবহন করে। এপ্রিল ২০২৫ সালে ইউরোপের প্রথম বিমানবন্দর হিসেবে ত্রি-স্বতন্ত্র রানওয়ে অপারেশন চালু করে। যা ঘণ্টায় ফ্লাইটের সংখ্যা ১২০ থেকে ১৪৮ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে হওয়ায় ছোটখাটো সমস্যা দ্রুত বড় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ২০২৫ সালে সিরিয়াম জানিয়েছে, ‘বেশি ফ্লাইট এবং জটিলতা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।’
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের ওন-টাইম পারফরম্যান্স (ওটিপি) অর্থাৎ ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিটের মধ্যে ছাড়ার বা পৌঁছানোর হার, ছিল ৮০.৭২ শতাংশ। ওটিপি অনুযায়ী এটি বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে ১৯তম স্থানে আছে। তবে সিরিয়াম বলেছে, প্লাটিনাম বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ওটিপি নয়। দৈনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ফ্লাইট শিডিউল বাস্তবায়ন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পুনরুদ্ধারের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ল্যাটিন আমেরিকার সেরা বিমানবন্দর
ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন বিমানবন্দরও ২০২৫ সালে চমক দেখিয়েছে। ওটিপি অনুযায়ী বিশ্বের সেরা বড় বিমানবন্দর ছিল সান্টিয়াগো আর্তুরো মেরিনো বেঞ্জিটেজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চিলি (এসসিএল)। এখানে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩২৬টি ফ্লাইটের মধ্যে ৮৭.০৪ শতাংশ সময়নিষ্ঠতা রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২২ সালে এই বিমানবন্দর নতুন টার্মিনাল ২ চালু করেছে। যা তার বার্ষিক যাত্রী ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে।
মাঝারি আকারের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে সেরা ছিল পানামা সিটি টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (পিটিওয়াই)। ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫ ফ্লাইটের মধ্যে ৯৩.৩৪ শতাংশ ওটিপি রেকর্ড করা হয়েছে।
ছোট আকারের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে সেরা ছিল গুয়ায়াকুইল জোসে জোয়াকিন দে অলমেদো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জিওয়াইই), ইকুয়েডর। ৩৪ হাজার ৬৮ ফ্লাইটের মধ্যে ৯১.৪৭ শতাংশ ওটিপি বজায় রাখা হয়েছে।
সিরিয়াম অনুযায়ী, বড় বিমানবন্দর বছরে ২৫-৫০ মিলিয়ন আসন পরিচালনা করে, মাঝারি ১৫-২০ মিলিয়ন আর ছোট ৫-১৫ মিলিয়ন আসন পরিচালনা করে।
প্লাটিনাম বিজয়ী এয়ারলাইন
কাতার এয়ারওয়েজ ২০২৫ সালে প্লাটিনাম বিজয়ী হিসেবে সেরা এয়ারলাইন নির্বাচিত হয়েছে। ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩০৩ ফ্লাইটের মধ্যে এয়ারলাইনটি ৮৪.৪২ শতাংশ সময়নিষ্ঠতা দেখিয়েছে, যা ২০২৪ সালে ৮২.৮৩ শতাংশ ছিল। সিরিয়াম বলেছে, জিওপলিটিক্যাল সমস্যা, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বিমান সরবরাহে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এয়ারলাইন্সটি মূল সংযোগগুলো ঠিক সময়ে পৌঁছে দিয়েছে।
ওটিপি অনুযায়ী বিশ্বের সেরা এয়ারলাইন ছিল এরোমেক্সিকো ৯০.০২ শতাংশ ওটিপি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সেরা ছিল ফিলিপাইন এয়ারলাইন্স, যা ১ লাখ ১৬ হাজার ২৬৮ ফ্লাইটের মধ্যে ৮৩.১২ শতাংশ সময়নিষ্ঠতা দেখিয়েছে। উল্লেখ্য, ফিলিপাইনের মানিলা নিনয় আকুইনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জ্যাম প্রবণ।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ
উত্তর আমেরিকার সেরা এয়ারলাইন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ডেল্টা এয়ারলাইনস। যা ১.৮ মিলিয়ন ফ্লাইটে ৮০.৯ শতাংশ ওটিপি দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর বারবার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সমস্যা এবং ৪৩ দিনের সরকারি শাটডাউন চলেছে। তা সত্ত্বেও ডেল্টা একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ইউরোপে তৃতীয়বারের মতো সেরা এয়ারলাইন হয়েছে স্পেনের ইবেরিয়া এক্সপ্রেস। ৩৭ হাজার ১১৯ ফ্লাইটে এয়ারলাইনটি ৮৮.৯৪ শতাংশ ওটিপি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি অর্জিত হয়েছে বড় পাওয়ার আউটেজ এবং এয়ারবাস এ৩২০ ফ্লিটের গ্লোবাল সফটওয়্যার সমস্যার মধ্যেও।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সেরা এয়ারলাইন হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্লাইসাফএয়ার নির্বাচিত হয়েছে। ৬২ হাজার ৮০৫ ফ্লাইটে এয়ারলাইনটি ৯১.০৬ শতাংশ ওটিপি বজায় রেখেছে।
ল্যাটিন আমেরিকার অন্য একটি সেরা এয়ারলাইন হলো পানামার কোপা এয়ারলাইনস, যা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৮ ফ্লাইটে ৯০.৭৫ শাতাংশ সময়নিষ্ঠতা দেখিয়েছে। সিরিয়াম বলেছে, এই অঞ্চল ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিমান চলাচলের সবচেয়ে গতিশীল অঞ্চলের একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বিশ্বের মোট যাত্রী চলাচলের ৮.৫ শতাংশ দখল করবে।
সবশেষে ভার্জিন অ্যাটলান্টিক নির্বাচিত হয়েছে সবচেয়ে উন্নত এয়ারলাইন হিসেবে। ২০২৫ সালে এটির ওটিপি ৮৩.৪৫ শতাংশ পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালে ৭৪.০১ শতাংশ ছিল।
২০২৫ সালে এই বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনগুলো সময়নিষ্ঠতার দিক থেকে যাত্রী সন্তুষ্টি, খরচ সাশ্রয় এবং অপারেশনাল দক্ষতার ক্ষেত্রে সেরা প্রমাণিত হয়েছে। যাত্রীরা নিরাপদ ও সময়মতো তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পেয়েছে, যা বিমান চলাচলের নতুন মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



