সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচিত শব্দযুগল হলো ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’। এর বহুল ও নানামাত্রিক ব্যবহার এখন লক্ষণীয়। যে কারণে এর উদ্ভব, তার পাশাপাশি অনেক কিছুতেই ব্যবহার হচ্ছে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’। এসবের মধ্যে সংবাদমাধ্যমও আছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কেউ কেউ অভিযোগ করে থাকেন যে, সংবাদমাধ্যম কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবাদ প্রচারের কারণেই অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে এবং রুচির দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ে বেশি সংবাদ বা তথ্য প্রচারের কারণেই রুচির দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়? নাকি জনমানুষের সার্বিক রুচির দুর্ভিক্ষের কারণেই ওইসব সংবাদ তৈরি হয় বা তৈরি করতে হয়? তবে কী এটা ডিম আগে না মুরগী আগের মতো বিতর্কে পর্যবসিত হচ্ছে?
সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আর রাষ্ট্র, সরকার ও গণতন্ত্র– এই তিনের জন্যই অতি জরুরি অনুষঙ্গ হলো সংবাদমাধ্যম। ওপরের তিনটি জিনিসই যেহেতু জনগণের জন্য তৈরি, তাই সংবাদমাধম্যকেও জনগণের সেবা করার জন্যই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হয়। সংবাদমাধ্যমের কাজই হলো এই সবকিছুকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। তবে দিন দিন সংবাদমাধ্যম শিল্পেও ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। উন্নত দেশগুলোতে এই পরিবর্তনের গতি বেশি। আমাদের মতো দেশগুলোতেও ধীরে হলেও পরিবর্তন হচ্ছে। কারণ, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নামক দুটি বস্তুর কল্যাণে সংবাদের মাধ্যমগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেলের তুলনায় এখন ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল মিডিয়া। তাই মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকেই সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হচ্ছে। নইলে প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও এ দেশে গণমাধ্যম কতটা শিল্প হয়ে উঠতে পেরেছে, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। সেই বিতর্ক আজকে না হয় থাক। আজ বরং রুচির দুর্ভিক্ষের সুলুকসন্ধান করা যাক।
প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে কি প্রভাব বিস্তারে, কি ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই। বিশেষ করে মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যাপল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো। মানুষের ওপর সামাজিক যোগাযোগের ভার্চুয়াল মাধ্যমগুলোর প্রভাব এখন ব্যাপক। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, মানুষের সার্বিক মনোজগত গঠনে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক প্রভৃতির ভূমিকা এখন অপরিসীম। যে জনমত আগে সংবাদমাধ্যমগুলোর কারণে সৃষ্টি হতো, এখন তা তৈরি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এবং ফেসবুক-ইনস্টা প্রযুক্তিগতভাবে যেভাবে চালিত হচ্ছে, তাতে এর অপব্যবহারেরও বিরাট আশঙ্কা আছে।
কারও কারও শঙ্কা, ভবিষ্যতে জনমানুষের আবেগকে চাইলে ভুল পথে চালিত করতে পারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। যদিও ফেসবুক-ইনস্টা বা টিকটক এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাদের সব কার্যক্রম চলে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছুর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করে না। অবশ্য এ নিয়ে ভিন্ন মতের অভাব নেই।
কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আসলে কোন ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে? এগুলোর কর্মপদ্ধতি আসলে কেমন? এ নিয়ে সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এমন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা ব্যবহারকারীর সোশ্যাল মিডিয়ার আচরণ বিশ্লেষণ করে সেটিকেই ব্যবহার করে ব্যবসার উপকরণ হিসেবে। ব্যবহারকারীর ফিডে সেই ধরনের পোস্টই দেখানো হয়, যা সে দেখতে পছন্দ করে। অর্থাৎ, একজন ব্যবহারকারী সাধারণত যে ধরনের পোস্ট বা কনটেন্ট দেখে অভ্যস্ত, তাকে তাই দেখানো হয়। ধরুন, আপনি নিজের কোনো পরমাত্মীয়র পোস্ট এড়িয়ে গিয়ে কোনো সেলিব্রেটি অভিনেত্রীর পোস্ট দেখে আটকে গেলেন এবং তা আপনার বন্ধুকে পাঠালেন। তাহলে এর পর থেকে আপনার সোশ্যাল ফিডে আসতে থাকবে শুধু সেলিব্রেটিদের পোস্ট। এমনকি আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রোফাইলের ফলো বাটনেও ক্লিক করেন, তাহলেও ওই ব্যক্তির সব পোস্ট আপনাকে দেখানো হবে না। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার হাতে থাকা আপনার আচরণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যেগুলো মিলবে, শুধু সেই পোস্টগুলোই দেখানো হবে। বাকিগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার স্ক্রলিংয়ে আপনার সামনেই আসবে না।
এর অর্থ হলো, সোশ্যাল মিডিয়াতে সাধারণত যেসব ফিড আপনার সামনে আসবে, তা আসলে আপনারই প্রতিচ্ছবি। আপনি যদি কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি বা বিষয়সংক্রান্ত পোস্ট ও নিউজ বেশি পান, তার মানে হলো আপনি আসলে ওই ব্যক্তি বা বিষয়টিকেই ‘পছন্দ’ করেন সোশ্যাল মিডিয়াতে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর এই ধরনের অ্যালগরিদম মডেলে ত্রুটি অনেক। এতে একজন ব্যবহারকারী একটি বৃত্তের মধ্যে আটকে যান। চাইলেও তা থেকে বের হতে পারেন না।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ইচ্ছে করেই ‘এক্সট্রিম কনটেন্ট’গুলোকে (সহিংসতা, ভীতি বা বিতর্কের দিক থেকে) দর্শকদের সামনে বেশি বেশি হাজির করে। এর আগেও এমন অভিযোগ উঠেছে অবশ্য। সহিংসতা বা ঘৃণার বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো উৎসাহী ভূমিকা রাখে বলে মতামত অনেক বিশ্লেষকের। বলা হচ্ছে, এনগেজমেন্ট দ্রুত বাড়ে বলেই এ ধরনের কনটেন্টের প্রচারে ‘বিশেষ’ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর চালানো এমন অ্যালগরিদমের খেলাতে অংশ নিতে হয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও। টিকে থাকার জন্যই। ৬টি মহাদেশ ও ৪৬টি বাজার থেকে সংগ্রহ করা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তৈরি রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংবাদ পড়ার ক্ষেত্রে ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ায় (পত্রিকা, টেলিভিশন) মানুষের আগ্রহ ক্রমশ কমছে। ভোক্তারা ঝুঁকছে ডিজিটাল মিডিয়ায়। আর সংবাদ পাওয়ার উৎস হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া এখন মানুষের অন্যতম পছন্দের জায়গা। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমের সংবাদগুলোও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো চাইছে, সংবাদমাধ্যমগুলো যেন সরাসরি তাদের প্ল্যাটফর্মেই সংবাদ পরিবেশন করে। যেমনটা সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক মুখ ফুটে বলেই ফেলেছেন।
ইলন মাস্ক বলেছেন, এক্স বা সদ্য সাবেক হওয়া টুইটারে যেন সাংবাদিকেরা সরাসরি নিউজ লেখেন। ফলে যে খেলার যে নিয়ম! সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের সঙ্গে কিছুটা হলেও তাল মেলাতেই হচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলোকে। নইলে থাকছে পাঠক-দর্শক হারানোর ভয়। কারণ সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর আছে শত শত কোটি ব্যবহারকারী, যার অধিকাংশই বয়সে তরুণ। উদাহরণ হিসেবে শুধু ফেসবুক ও ইউটিউবের কথাই ধরুন। এই দুই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই আছে প্রায় ৫০০ কোটি ব্যবহারকারী। এদের বেশির ভাগেরই বয়স আবার ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তার মানে হলো, তাল মেলাতে না পারলে এত এত পাঠক-দর্শকের কাছে আর পৌঁছানো হবে না সংবাদমাধ্যমগুলোর।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অ্যালগরিদমের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মূল ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো যে সাংবাদিকতার মূলনীতি থেকে কখনো কখনো সরতে বাধ্য হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। বিশ্বজুড়েই এই আলোচনা ও বিতর্ক বিদ্যমান। তবে এর কোনো সঠিক সীমাও টানা সম্ভব হয়নি এখনো। কারণ শার্টের কলার ঠিকমতো বানাতে গেলে, হাতার কাপড়ে টান পড়ে যাচ্ছে যে!
আর ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই আমাদের দেশে ওঠে রুচির দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ। কারও কারও মতে, বিতর্কিত ব্যক্তি বা ইস্যুতে (যেমন: হিরো আলম বা রাজ-পরীমণি) বেশি বেশি নিউজ দেওয়া রুচির দুর্ভিক্ষের বহিঃপ্রকাশ। এবং এসব সংবাদ করাই উচিত না। এতে অপসংস্কৃতির জোয়ার উঠছে। সমস্যা হলো, জনরুচিই কি এমনটা নয়? সংবাদমাধ্যমগুলো তো সংবাদ প্রকাশ করে তার দর্শক ও পাঠকের বিষয়টি মাথায় রেখেই। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের রিপোর্টই বলছে, সাধারণ মানুষের বেশি আগ্রহ বিনোদন বা খেলার তারকা, ইনফ্লুয়েন্সার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত ব্যক্তিদের খবরে। আর এতে বিশ্বাস না করলে নিজেই একবার ঘুরে আসুন বিভিন্ন বড় বড় মিডিয়া হাউজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের পেজগুলোতে। কিছু নির্দিষ্ট পোস্ট বা কনটেন্টে এনগেজমেন্ট আর রিচের মহাসমারোহতে চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়ে যাবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো দেশের বিদ্যমান জনরুচিই যদি এমন হয়, তবে সংবাদমাধ্যমগুলো কি তার থেকে খুব আলাদা হবে? উত্তর হলো, না। গাছ যেমন, ফল তেমনিই হবে। আম গাছে তো আর জাম ধরবে না। তবে হ্যাঁ, সঠিক পরিচর্যায় আম গাছের পোকায় ধরা আমের সংখ্যা কমানো যায়। এই কাজটিই এখন করা জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে ওঠা জনবলকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য না করে ধীরে ধীরে মানসম্মত কনটেন্টের সংখ্যা বাড়ানো যায়। যদিও বিদ্যমান ব্যবস্থাতেও নানা ধরনের ‘সিরিয়াস’ কনটেন্ট সংবাদমাধ্যমগুলোতে থাকে, এবং ভালো সংখ্যাতেই। নিজ অভিজ্ঞতাতেই বলতে পারি, সেইসব ভালো ও তথ্যপূর্ণ কনটেন্টগুলোতে পাঠক ও দর্শকের ভিড় খুব একটা হয় না। ফলে যারা বলেন, সংবাদমাধ্যমের তৈরি কিছু সংবাদের কারণে রুচির দুর্ভিক্ষ হচ্ছে, তারাও ভালো কনটেন্টে কতটুকু সময় দেন– তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
অবশ্য এটি বলতেই হয় যে, ঐতিহাসিকভাবেই জনরুচি নির্মাণে অবদান রাখাও সংবাদমাধ্যমের একটি দায়িত্ব। আর আমাদের দেশে তো বটেই। এখানে দীর্ঘদিন ধরেই ভালো ও মন্দের নিক্তির হেলদোলে সংবাদমাধ্যম এক ধরনের ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে। আবার তাতে নানামাত্রিক চাপও থাকে। সেই চাপের মধ্যে তথাকথিত জনরুচির চাপও একটি। কথা হলো- একটি বিশাল জনগোষ্ঠী নিজেরা পরিবর্তিত না হয়ে, যদি শুধু অন্যের পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, তবে তা কখনোই ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু আমাদের দশা হয়েছে এই, নিজেরা যেটা পারি না, সেটাই অন্যকে পরামর্শ দিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে মুখ ফুটে বলা কথিত ‘অপসংস্কৃতি’র পালে হাওয়া (মতান্তরে লাইক-শেয়ার) দিয়ে এসেও!
তাই বলে কি, সব সংবাদমাধ্যম ধোয়া তুলসি পাতা? অবশ্যই নয়। যে মন্বন্তরের ডংকা বাজানো হয় বা হচ্ছে, তার ছোঁয়া সবখানেই লেগেছে। অবনমন শুধু এক জায়গায় হয়নি, মোটামুটি সবখানেই তার চিহ্ন আছে। তাই ইতিবাচক পরিবর্তনটাও সামগ্রিক অর্থেই হতে হবে এবং তার শুরুটাও। একে-অন্যকে অন্ধভাবে দোষারোপে এবং ‘আমি কত ভালো, অন্যরা কত খারাপ’ মনোভাবে কোনো লাভ হবে না। বরং একে-অন্যকে টেনে ধরতে গিয়ে শুধু নিচেই নামতে হবে!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



