পুতিনের জন্য হুমকি কে? জীবিত, নাকি মৃত নাভালনি?

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:২৬ পিএম

কোনো কোনো মৃত্যু পুনর্জন্মের প্রবেশদ্বার মাত্র। পৃথিবীর অনেক নেতা মৃত্যুর পর আবার সদর্পে বেঁচে উঠেছেন জনগণের মধ্যে। তাঁদের এই ‘বেঁচে ফেরা’ নিশ্চয়ই সশরীরে নয়, তাঁরা জীবিত হয়ে ওঠেন তাঁদের আদর্শের মাধ্যমে, তাঁদের রেখে যাওয়া কাজের মাধ্যমে। রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা, যিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেই অ্যালেক্সাই নাভালনির রহস্যজনক মৃত্যুর পর এই আলোচনা আবার প্রাণ পেয়েছে যে, ‘মৃত’ নাভালনি কি ‘জীবিত’ নাভালনির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবেন কি না!

এমন আলোচনা শুরু হওয়ার কারণও আছে বৈকি। বলা হয়ে থাকে, নাভালনিকে সবচেয়ে ভয় পেতেন পুতিন। তিনি তাঁকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে করতেন। কারণ নাভালনির এক ডাকে রাস্তায় নেমে পড়ত হাজার হাজার মানুষ।

নাভালনিকে অসম্ভব পছন্দ করেন রুশ তরুণেরা। তাঁকে ‘জনতুষ্টিবাদী’ নেতা মনে করতেন তারা। বিপুল সংখ্যক নাভালনির সমর্থক ও ভক্ত মনে করেন নাভালনি ‘রাশিয়ার ম্যান্ডেলা’। তাঁকে ২০২১ সাল থেকে কারাবন্দী করে রেখেছিল রুশ প্রশাসন। উগ্রপন্থায় উসকানি ও অর্থায়ন এবং একটি উগ্রপন্থী সংগঠন প্রতিষ্ঠার দায়ে নাভালনিকে গত বছরের আগস্টে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় পুতিনের সরকার। 

২০২০ সালে একবার নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল রুশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া এলাকা থেকে উড়োজাহাজে যাত্রার সময় ফ্লাইটের ভেতর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে উড়োজাহাজে করে বার্লিনে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কোমায় ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তখনই পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিলেন নাভালনিকে। যদিও শেষ পর্যন্ত এ অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি।

নাভালনির ডাকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসত। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াপরে ২০২১ সালে জার্মানি থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন নাভালনি। ‘রাশিয়া আমার দেশ, আমি মাতৃভূমিতে ফিরতে চাই’—বলেন নাভালনি। তারপর উড়োজাহাজে চেপে ফিরেও আসেন রাশিয়ায়। কিন্তু নিজের বাড়িতে আর ফিরতে পারেননি। পুতিনের বাহিনী তাঁকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করে। তারপর পুরোনো একটি মামলায় কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছিল।

মাঝখানে একবার শোনা গেল, কারাগার থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছেন নাভালনি। তাঁর আইনজীবী অভিযোগ করে বলেছিলেন, কারাগারে নাভালনির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর কোনো হদিস। এর প্রায় ২৫ দিন পর সাইবেরিয়ার ইয়ামালো-নেনেটস অঞ্চলের কুখ্যাত ‘পেনাল কলোনি’ কারাগারে সন্ধান মেলে নাভালনির। জানা যায়, তিনি বেঁচে আছেন।

সেই কারাগারেই গতকাল শুক্রবার নাভালনি মারা গেছেন বলে জানাল রুশ প্রশাসন। কিন্তু কীভাবে মারা গেলেন, তা এখনো অজানা। নাভালনির স্ত্রী ইতিমধ্যেই এ মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, নাভালনির মৃত্যুর জন্য পুতিন দায়ী।

এসব তদন্তাধীন বিষয়কে এক পাশে রেখে বিশ্লেষকেরা এখন যেটি নিয়ে সরব হয়েছেন, সেটি হচ্ছে, মৃত নাভালনি হয়তো জীবিত নাভালনির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। তিনি জীবিত থাকতে পুতিনের দুর্নীতির বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরতে যে ব্রত নিয়েছিলেন, যেভাবে জনতুষ্টিবাদী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এবং যে আদর্শের প্রচার চালিয়েছেন, সেই সবই হয়তো ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভষ্ম থেকে জেগে উঠবে।

এমন পূর্বানুমানের পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে বটে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মাত্র ৪৭ বছরের জীবনে নাভালনি যে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, সমর্থক ও অনুসারী রেখে গেছেন, তারাই এখন নাভালনির রেখে যাওয়া কাজকে এগিয়ে নেবেন। তারাই তাঁর আদর্শকে, তাঁর কাজকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন। আর এভাবেই ‘মৃত’ নাভালনি ‘জীবিত’ নাভালনির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, নাভালনি শুধু একটি নাম নয়, একটি আদর্শও বটে। তিনি পুতিনের জন্য একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিলেন এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর বিরোধী নেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রাশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন একটি বড় ধরণের ধাক্কা খেল নিঃসন্দেহে। কিন্তু কোনো কোনো ধাক্কা ঘুরে দাঁড়ানোরও শক্তি জোগায়। নাভালনির মৃত্যু তাঁর সমর্থকদের মধ্যে শক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে এবং তাঁর রেখে যাওয়া গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে।

পুতিনের ‘অপশাসনের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নাভালনি যে কৌশল তৈরি করেছিলেন, তা ইতিমধ্যেই রাশিয়ার অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নাভালনির ‘নিষ্ঠুর মৃত্যু’ আরও অনেক রুশকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করবে বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।

অসংখ্য রুশ নাগরিক বিশ্বাস করেন, নাভালনিকে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। গত তিন বছর ধরে কারাগারে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এমনকি তাঁকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এসব কারণে নাভালনির জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে আরও বেড়েছে বৈ কমেনি।

বহুবার পুতিনের প্রশাসনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নাভালনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়ানাভালনির জনপ্রিয়তা বাড়ার আরেকটি বড় কারণ, তিনি পুতিনের প্রশাসনের সীমাহীন দুর্নীতি সাধারণ মানুষদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষদের এটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, রাশিয়ার অভিজাত রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষদের কষ্টার্জিত সম্পদ চুরি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। প্রতিটি ধনকুবের রুশ নাগরিকের সম্পদে গরীব জনগণের হিস্যা রয়েছে। তাঁর এই ‘ক্যারিশমা’ তাঁকে মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

নাভালনির উত্থান ২০১১–১২ সালের দিকে ‘বোলতনায়া’ বিক্ষোভের সময়ে। ওই সময়ে নাভালনির ডাকে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ পুতিনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, তা স্মরণ করে এখনো হয়তো শিউরে ওঠেন পুতিন। তারপর থেকে নাভালনির বিরুদ্ধে পুতিনের প্রশানের দমনপীড়ন যত বেড়েছে, নাভালনির শক্তি, সামর্থ্য ও জনপ্রিয়তাও তত বেড়েছে।

২০১৩ সালে মস্কো থেকে মেয়র নির্বাচনে লড়েছিলেন নাভালনি। পুতিনের রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁকে সর্বাত্মক বাধা দেওয়ার পরেও তিনি ২৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ছিল সব সময়ই আন্দোলনকেন্দ্রিক। তিনি আন্দোলনের ডাক দিলেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসত।

২০১৮ সালেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নাভালনি। সেই সময়ে তিনি রাশিয়াজুড়ে যে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, তা পুতিনের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

নাভালনির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত সংস্থা ‘এফবিকে’ রয়ে গেছে। নাভালনি যখন কারাগারে ছিলেন, তখনও এই সংস্থা পুতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত অব্যাহত রেখেছে এবং নিয়মিত জনগণকে সেসব অবহিত করেছে। যদিও পুতিন ওই সংস্থার বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন, তবুও এফবিকের কাজ পুরোপুরি থামানো যায়নি।

এ ছাড়া নাভালনির ছিল ‘নাভালনি লাইভ’ নামে ইউটিউব চ্যানেল। এটি রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল। এই চ্যানেলের মাধ্যমেই তিনি লাখ লাখ রুশদের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছে দিতেন এবং পুতিনের যাবতীয় দুর্নীতি ও অপশাসন তুলে ধরতেন। নাভালনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কি চ্যানেলটিরও মৃত্যু হবে? বিশ্লেষকদের ধারণা, এমনটি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বরং তাঁর প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনীই চ্যানেলটিকে চালিয়ে নিতে পারেন।

স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার সঙ্গে নাভালনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়ারাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নাভালনির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর ‘নৈতিক সাহস’। শত বাধা বিপত্তি, নির্যাতন ও দমন–পীড়ন সত্ত্বেও তিনি তাঁর নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। এসব কারণেই তিনি মৃত্যুর পরও সাধারণ মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারেন।

নাভালনির কাজকর্ম নিয়ে বানানো একটি তথ্যচিত্র ২০২২ সালে অস্কার পুরস্কার পেয়েছে। সেই তথ্যচিত্রে দেখা যায়, নাভালনিকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ‘আপনাকে যদি হত্যা করা হয়, তার আগে আপনি কী বার্তা দিতে চান?’ জবাবে নাভালনি বলেছিলেন, ‘তারা (রুশ সরকার) যদি আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমরা তাদের চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের এই শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। কখনোই হাল ছাড়া যাবে না, এমনকি আমার মৃত্যু হলেও।’

নাভালনির এই সহজ বার্তা যদি বিপুল সংখ্যক সমর্থকদের মনে গেঁথে যায়, তাহলে মৃত নাভালনি যে জীবিত ব্যক্তির চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন, তা হলফ করে বলাই যায়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও আটলান্টিক কাউন্সিল 

প্রযুক্তির চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন দেশে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি নতুন জুয়ার সাইট খুলছে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। একটি বন্ধ হলে পরের দিনই নতুন নামে হাজির আরও পাঁচটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে,...
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই? কারণ, একের পর এক যেভাবে রাশিয়া, চীন আর ইরান একই লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে বড় প্রশ্ন—আমেরিকার...
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর কেবল গোলাবারুদ কিংবা কামানের গর্জনে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হচ্ছে না, বরং আকাশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ড্রোন ও রোবট। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে...
ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার সুর উঠে আসছে। এই...
চলমান গ্যাসের সংকট কাটতে দেড় সপ্তাহের মতো লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ বুধবার রাজধানীতে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত তুরাগ নদীর ওপর নির্মিত দুই লেনের দুটি সার্ভিস লাইন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
অসুস্থ হয়ে রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তাঁকে দেখতে আজ বুধবার সকালে হাসপাতালে...
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিআরটিসির বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনটি বাস দিয়ে এ পরিবহনসেবা চালু হলো।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর