ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হতো ‘কট্টরপন্থী’ ইব্রাহিম রাইসিকে। রাইসির আমলে আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালেও সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে। এ ছাড়া গত মাসে সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইরান। এ ঘটনায় মুসলিম ধর্মাবলম্বীর অনেকেই রাইসির প্রশংসা করলেও নিন্দাও শুনতে হয়। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বিভিন্ন বিতর্ক হয়েছে তাঁকে নিয়ে।
ইব্রাহিম রাইসির জন্ম ইরানের উত্তরপূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে, ১৯৬০ সালে। জায়গাটি ইরানের শিয়াদের পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। তাঁর বাবা ছিলেন ধর্মীয় নেতা। বাবার মৃত্যুর পর ৫ বছর বয়সে শহর ছেড়ে চলে যান কুমে। সেখানে শিক্ষার্থী থাকাবস্থায় ইসলামি বিপ্লবে অংশ নেন রাইসি।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ-এর শাসনের পতন ঘটে। এরপর ১৯৮১ সালে রাইসি যোগ দেন বিচার বিভাগে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তেহরানের ডেপুটি প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন রাইসি। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত উপপ্রধান বিচারপতি, ২০১৬ সাল পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি ছিলেন ইব্রাহিম রাইসি।
২০২১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন রাইসি। এর আগে ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও হেরে যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির কাছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন রাইসি। তাঁকে দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। এমনকি খামেনির পর রাইসিই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হবেন বলে গুঞ্জন ছিল। তাঁর মৃত্যুতে সেই সুযোগ শেষ হয়ে গেল। কপাল খুলে গেল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতবার। পরবর্তি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ায় রাইসিই তাঁর একমাত্র বাঁধা ছিলেন।
২০২২ সালে পুলিশী হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে বড় ধরনের বিক্ষোভ-সহিংসতা দেখা যায় এই রাইসির আমলেই।
এদিকে, রাইসি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আমেরিকার সাথে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা আটকে যায়। ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে সরে ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন।
আমেরিকার সাথে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যেই ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণে সমর্থন দেন রাইসি। তাঁর আমলে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানোসহ আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে বাধা দেয়। সবশেষ গাজায় আগ্রাসনে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। হিজবুল্লাহ ও হুতিকে অস্ত্র সহায়তা বাড়ায় তেহরান।
গত মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ায় ইরান। গত ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে নিজেদের কনস্যুলেটে হামলায় বিপ্লবী গার্ডের ৭ সেনা নিহতের জবাবে পাল্টা ইসরায়েলি ভূখণ্ড হামলা চালায় ইরান। এরপর পাল্টাপাল্টি আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি দিলেও অবস্থান বদলায় তেহরান-তেল আবিব।
ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ইব্রাহিম রাইসি ইরানের একজন ধর্মীয় ‘কট্টরপন্থী’ নেতা ছিলেন। ইরানে বাকস্বাধীনতাকে চূর্ণ করা এবং নারীদের জন্য কঠোর ‘হিজাব ও সতীত্ব আইন’ প্রয়োগ করার মতো পদক্ষেপ দেওয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২২ সালে পুলিশী হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়। হিজাব না পরার কারণে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মাহসা। শুধু তাই নয়, ১৯৮৮ সালে ইরানের রাজনৈতিক বন্দীদের গণফাঁসির পেছনে রাইসির ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই অনেকের কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে ‘তেহরানের কসাই’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন রাইসি।
ইসরায়েল ও ইরানের সাংবাদিক, বিশ্লেষক জোনাথন হ্যারনওফ ইরান ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, ‘একজন সংরক্ষণশীল নেতা ছিলেন রাইসি। এর পাশাপাশি বর্বর বিচার ব্যবস্থা প্রয়োগের মাধ্যমেই তিনি নিজের আসন পাকাপোক্ত করেছেন। হাজারো বন্দীর প্রাণ গেছে তার হাতে। আর এ কারণেই তাকে তেহরানের কসাই ডাকা হয়।’
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি। এক প্রতিক্রিয়ায় হুতির মুখপাত্র মোহামেদ আব্দুসালাম বলেন, রাইসির মৃত্যু মুসলিম বিশ্বের বড় ক্ষতি। এই মৃত্যুতে ইরান ছাড়াও গাজা ও ফিলিস্তিনবাসীর ক্ষতি হয়ে গেল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এ ছাড়া ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও প্রতিক্রিয়া জানায়।
হুতির মুখপাত্র মোহামেদ আব্দুসালাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক টুইটে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যু শুধু ইরানের জন্য বড় ক্ষতি নয়। এটি পুরো মুসলিম বিশ্ব এবং ফিলিস্তিন ও গাজার জন্য হুমকি। অধিকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পর্যন্ত সবখানে এই প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি খুব দরকার।’
নানা কারণে বিতর্কিত এই নেতা পশ্চিমাদের কাছে ছিলেন চক্ষুশূল। মুসলমানদের একটি অংশ তাঁকে ব্যাপক সমর্থন দিতেন। এর বেশ কিছু কারণও ছিল। একবার জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি পবিত্র কোরআনে চুমু খেয়েছিলেন।
গাজায় ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় ইরানের এই নেতাই বারবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকি হামাসকেও সরাসরি সমর্থন দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আমেরিকার ঘাঁটিকে টার্গেট করে ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা তাঁর নির্দেশেই হয়ে আসছে বলে অভিযোগ। ইয়েমেনে হুতি ও লেবাননে হিজবুল্লাহর কার্যক্রমও রাইসির কথামতোই হতো বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
রাইসির সময় আরও একটি বড় অর্জন আসে ইরানের। দীর্ঘদিনের সংঘাত ভুলে সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও স্থাপন করেন ইরানের এই ইব্রাহিম রাইসি।
সবশেষ রাইসির এক বক্তব্য দিলে বোঝা যাবে তিনি কেন অনেক মুসলিমের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। গত এপ্রিলে ইসরায়েলে হামলার পর রাইসি বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি মুসলিম বিশ্বের কাছে প্রথম ইস্যু হচ্ছে এই ফিলিস্তিন। এবং আমরা মনে করি আমাদের জনগণ ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে, ইহুদিকে ঘৃণা করে। এই হামলার মাধ্যমে ইহুদিদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।’
গত রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি একটি বাঁধ উদ্বোধন করতে আজারবাইজান সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভও ছিলেন। সেখান থেকে তিনটি হেলিকপ্টারের বহর নিয়ে ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে ফিরছিলেন ইব্রাহিম রাইসি ও তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য কর্মকর্তারা।
পথে পূর্ব আজারবাইজানের জোলফা এলাকার কাছে পাহাড়ি এলাকায় প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির–আব্দুল্লাহিয়ান, ছয়জন কর্মকর্তা ও একজন ক্রু নিহত হন।


রাইসির মৃত্যুতে ইরানেই আতশবাজি পুড়িয়ে উৎসব!
রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ
এটি আমাদের কাজ নয়, রাইসির মৃত্যু নিয়ে বলল ইসরায়েল
