সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ভয়াবহ তথ্য দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ১০ বছরের একটি শিশু সাধারণ বাংলা বা ইংরেজি রিডিং পড়ে বুঝতে পারছে না, এমনকি সাধারণ যোগ-বিয়োগও পারছে না। একদিকে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি স্কুল আর ২ কোটি শিশুর বিশাল শিক্ষা ব্যবস্থা, অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের পর তীব্র শিখন ঘাটতি। কেন ভেঙে পড়ছে আমাদের প্রাথমিকে শিক্ষার বুনিয়াদ? আজকে আমরা বোঝার চেষ্টা করব, আসল গলদটা আসলে কোথায়।
প্রাথমিক শিক্ষায় ভঙ্গুরতা
শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, বাংলাদেশ কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাকে দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দিতে পেরেছে। শহর থেকে শুরু করে চর, হাওর, পাহাড় কিংবা উপকূলীয় এলাকা—সবখানেই প্রাথমিক স্কুল আছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে ২ কোটিরও বেশি শিশু। এর মধ্যে সরকারি স্কুলেই পড়ছে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী। কিন্তু সমস্যা হলো—স্কুলের পরিধি বাড়লেও শিক্ষার মান মোটেও বাড়েনি।
২০১১ সালের সঙ্গে ২০২২ সালের ফলাফলের তুলনা করলে মাথা ঘুরে যাবে। ২০১১ সালে তৃতীয় শ্রেণির ৬৭ শতাংশ শিশু যেখানে বাংলা পড়তে পারত, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে। আর গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ৫০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩৯ শতাংশে। অর্থাৎ এক যুগে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিচে নেমেছে।
শিখন ঘাটতির আসল কারণ কী?
এখন প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রজেক্টের পরও শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছে? শিক্ষাবিদ ও পরিসংখ্যানের আলোকেই উঠে এসেছে ৫টি মূল কারণ:
১. করোনার দীর্ঘ ধাক্কা: করোনাকালে প্রায় দুই বছর স্কুল বন্ধ ছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাট এক শিখন ঘাটতি ও পড়ালেখার প্রতি উদাসীনতা তৈরি হয়েছে, যা আজও কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
২. শিক্ষক সংকট ও কম বেতন: দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ খালি! ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে স্কুল। তা ছাড়া বেতন-ভাতা কম হওয়ায় নতুন মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসার আগ্রহ পাচ্ছেন না।
৩. দক্ষতার ঘাটতি: গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ দাবি করলেও ক্লাসরুমে বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে পারেন মাত্র ২৫ শতাংশ!
৪. বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন: বারবার কারিকুলাম বদলে ফেলায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
৫. দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা উপকরণের অভাব: শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, এখনো অনেক শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে খাতা-কলম বা শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারছে না।
হাজার হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?
আপনার করের টাকায় শিক্ষা খাতের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট রাখা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুটি বড় প্রকল্পে প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু ফলাফল কী? রেজাল্ট তো উন্নত হওয়ার বদলে আরও খারাপ হলো। শিক্ষাবিদরা বলছেন—সরকার ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো তৈরিতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে ঠিকই, কিন্তু মূল জায়গায় হাত দেয় না! আসল জায়গাটি হলো—মেধাবী শিক্ষক তৈরি করা, শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের সম্মানজনক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া। দক্ষ শিক্ষক না থাকলে হাজার কোটির ভবন তুলে কোনো লাভ নেই।
কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
তাহলে এই সংকট কাটাতে সরকার কী করছে? বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সামনে আসছে ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প। সরকার এখন লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদানে জোর দিচ্ছে। আর এটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এগুলো হলো:
৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ: শূন্য পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব: শিক্ষকরা যেন ছবি, ভিডিও ও অ্যানিমেশন দিয়ে সহজভাবে পড়াতে পারেন, সেজন্য শিক্ষকদের ট্যাব দেওয়া হচ্ছে।
সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বই যুক্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২২ লাখ শিশু নিয়ে দেশজুড়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্কুল সরঞ্জাম: ব্যাগ, জুতা, ইউনিফর্ম ও ওয়াশ ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শেষ কথা একটাই—শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন, ট্যাব বিতরণ কিংবা ভবন বানালেই শিক্ষার মান ফিরবে না। স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় ও সম্মানিত করতে হবে, যাতে দেশের সেরা মেধাবীরা প্রাথমিকে শিক্ষক হিসেবে আসেন। কারণ শিক্ষকের হাতেই তৈরি হয় দেশের ভবিষ্যৎ।



