বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশগুলোর দুটির দুই রাষ্ট্রপ্রধানের ঘোষণার পর গত এক সপ্তাহে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা অনেক বেড়ে গেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর দেশের পারমাণবিক অস্ত্রসম্বলিত মিসাইলের পরীক্ষানিরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দেখাদেখি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষানিরীক্ষার নির্দেশ দিলেন।
দুই দেশের কোনোটিই নব্বইয়ের দশক থেকে আর পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি। এখন হঠাৎ করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে ক্রেমলিন দ্রুতই জানিয়ে দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন নতুন করে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার ঘোষণা দেননি!
এর মধ্যে আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক এশিয়া সফরে উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দাবি তো অনেক পুরোনো, কিন্তু এই বছরেও কয়েকবার সেই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। গত সেপ্টেম্বরে কিম জং উন নিজেই বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার আলোচনা তাঁদের কাছে ‘বিবেচনায়ই আসার মতো নয়।’
উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গটা নেটফ্লিক্সে গত সেপ্টেম্বরে প্রচারিত আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘আ হাউজ অব ডায়নামাইটস’-এও এসেছে। পারমাণবিক যুদ্ধ নিয়ে কাল্পনিক সেই চলচ্চিত্রে উত্তর কোরিয়াকে সম্ভাব্য ভিলেনদের একটি হিসেবে দেখানো হয়। যদিও ওই চলচ্চিত্রের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ‘পেন্টাগন’ এর সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, চলচ্চিত্রটিতে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সহজাতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেটা ঠিক নয়। সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকার নোয়াহ অপেনহাইম সিএনএনে বলেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ যে মানবজাতির জন্যই হুমকি এ দিকটি সামনে নিয়ে আসা।
পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ও এর হুমকি নিয়ে আলোচনা আগামী দিনে আরও বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ, রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ ও চালানে সীমা টেনে দেওয়ার চুক্তির (নিউ স্টার্ট ট্রিটি) মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে।
১৯৯১ সালে ‘স্টার্ট ১’ দিয়ে শুরু চুক্তিটি ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নবায়নের পর নাম হয় ‘নিউ স্টার্ট ট্রিটি’ নামে, ২০২০ সালে সেটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক দফা নবায়নের পর চুক্তিটির মেয়াদ বাড়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে চুক্তিটি কি এখন আবার নবায়ন করা হবে? এখন পর্যন্ত কোনো নড়চড় তো দেখা যাচ্ছে না।
এমন অবস্থায় পুতিন ও ট্রাম্পের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পাল্টাপাল্টি ঘোষণার গুরুত্ব কতটা? বিশেষজ্ঞরা এখন পর্যন্ত এসব ঘোষণাকে প্রতীকি হিসেবেই দেখছেন। এ নিয়ে সিএনএন কথা বলেছে টেক্সাসের এএন্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ফারমানের সঙ্গে। তাঁর মতে, ‘মস্কোর আসল উদ্দেশ্য কী সেটা বের করা কঠিন, ওরা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে ইঙ্গিতে এটাই বলছে যে – ইউক্রেন থেকে পিছু হটে যাও, তোমরা এভাবে নাক গলাতে থাকলে আমরা কী করতে পারি দেখ।’
ইউক্রেন নিয়ে সমাধান না এলে রাশিয়া-আমেরিকার ‘নিউ স্টার্ট ট্রিটি’র সম্ভাবনাও বাড়বে না বলে মনে হচ্ছে ফারমানের, ‘ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনা যতক্ষণ পর্যন্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে (পারমাণবিক) অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো চুক্তিতে যাবে বলে কল্পনা করা কঠিন।’ রাশিয়া আর আমেরিকার সঙ্গে চীনকেও যুক্ত করে এটিকে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বানানোর সম্ভাবনা কতটা? ফারমানের চোখে, চীন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও মজুদের ক্ষমতায় বাকি দুই দেশের কাছাকাছি এলে তখন হয়তো ত্রিপাক্ষিক চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই যখন অবস্থা, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে ঝামেলা বাড়তে থাকায়। ইরানের পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন হামলা চালানোর পর ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়নি। রাশিয়া ও আমেরিকার পর্যায়ে না হলেও চীনও পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব পুরোনো। পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ দুই প্রতিবেশি দেশ ভারত আর পাকিস্তানের বৈরিতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে।
বিগত বছরগুলোর তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি আরও বেড়েছে কি না, এমন প্রশ্নে ফারমান সিএনএনে বলেছেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে ২০২১ সালের শেষদিকেও এতটা উদ্বিগ্ন ছিলাম না, যতটা এখন উদ্বিগ্ন। এখানে যতটা ক্ষতি হতে পারে বলে ধরা হয়, তাতে যদি একেবারে অল্প কিছু ঝুঁকিও বাড়ে, ধরুন দুই শতাংশ, সেটাও উদ্বেগের ব্যাপার।’



