মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, গত বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গত অক্টোবরে পুরস্কারটা দেওয়া হয় ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে। ট্রাম্প এ নিয়ে ক্ষোভ কখনো গোপন রাখেননি। দিন দুয়েক আগে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে তো চিঠিতে সরাসরি বলেই দিয়েছেন, তাঁকে যেহেতু নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়নি, তিনিও তাই এখন আর শান্তির দিকটি ভাবতে বাধ্য নন! প্রসঙ্গত, নোবেল পুরস্কারটা নরওয়ে থেকেই দেওয়া হয়।
তা নোবেল শান্তি পুরস্কার কীভাবে দেওয়া হয়, তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। নিচে তা তুলে ধরা হলো -
কে সিদ্ধান্ত নেয়?
নরওয়ের পার্লামেন্টের মনোনীত পাঁচ সদস্য নিয়ে গঠিত নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এই সিদ্ধান্ত নেয়। অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদরাই সাধারণত এর সদস্য হন, তবে সব সময় নয়। বর্তমান কমিটির প্রধান পেন ইন্টারন্যাশনালের নরওয়ে শাখার সভাপতি, যে সংগঠনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে। কমিটির আরেকজন সদস্য একজন শিক্ষাবিদ।
কমিটির সব সদস্যকেই নরওয়ের গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক দল মিলে মনোনয়ন দেয়। ফলে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন থাকে।
কে পুরস্কার পাবেন, সেটা কি নরওয়ে সরকার ঠিক করে?
না। রাজনৈতিক দলগুলো একবার কমিটিতে নিজেদের মনোনীত সদস্য নিয়োগ দিলে, এরপর তারা কমিটির কাজে আর হস্তক্ষেপ করে না। কমিটির পাঁচ সদস্য ও তাদের সচিব ছাড়া বৈঠকে আর কেউ অংশ নেন না। বৈঠকের কোনো কার্যবিবরণীও রাখা হয় না।
অক্টোবরে কমিটির চেয়ারম্যান যখন বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন, তখনই সবার সঙ্গে একসঙ্গে তা জানতে পারে নরওয়ে সরকারও।
এর আগে কি বিদেশি চাপের মুখে পড়েছে নরওয়ে?
হ্যাঁ। সাধারণত কোনো বিদেশি সরকারের অপছন্দের ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হলে এমন চাপ আসে।
২০১০ সালে চীনা সরকারের বিরোধীপক্ষীয় লিউ শিয়াওবোকে পুরস্কার দেওয়ায় নরওয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে চীন। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন চীনও - ট্রাম্পের মতোই - অভিযোগ করেছিল যে নরওয়ে সরকারই পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ঠিক করেছে। তখন যেমন, এখনও নরওয়ে বলে আসছে — নোবেল কমিটি স্বাধীন, তাতে সরকারের হস্তক্ষেপ নেই।
শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে দুই দেশ আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এবং বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়। তবে এখনো কোনো বাণিজ্য চুক্তি সই হয়নি।
পুরস্কার কি অন্য কাউকে দেওয়া যায়?
নোবেল কমিটির ১৫ জানুয়ারির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিজয়ী চাইলে পদক, সনদ বা অর্থ অন্য কাউকে দিতে পারেন। তবে পুরস্কার পাওয়ার সম্মানটি সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই ‘অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত’ থাকে।
গত বছরের বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নিজের পদক ট্রাম্পকে দেওয়ার একদিন পর আসে নোবেল কমিটির এই বিবৃতি। মাচাদো তাঁর পদক ট্রাম্পকে দিয়ে দেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল — নিজের দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে ট্রাম্পের ভূমিকার ওপর প্রভাব ফেলা।
কারা পুরস্কারটা পান?
সংক্ষেপে বলা যায় — ১৮৯৫ সালে সুইডিশ শিল্পপতি আলফ্রেদ নোবেল–এর উইলে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, যিনি বা যাঁরা তা পূরণ করবেন, তাঁরাই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবেন। উইলে বলা আছে, পুরস্কারটি পাবেন সেই ব্যক্তি, ‘যিনি বিভিন্ন জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা বা হ্রাস করা এবং শান্তি সম্মেলন প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে সবচেয়ে বেশি বা সবচেয়ে ভালো কাজ করেছেন।’
তবে বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। নোবেল কমিটির সচিব ক্রিশ্চিয়ান বের্গ হারপভিকেন বলেন, পুরস্কারটি ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হয়।’ নোবেল কমিটির সচিব হিসেবে হারপভিকেন কমিটির কাজ এগিয়ে দেন, আলোচনায় অংশ নেন, তবে ভোট দেন না।
গত বছর রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘কমিটি বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে — কী ঘটছে, বৈশ্বিক প্রবণতা কী, প্রধান উদ্বেগগুলো কী এবং কোন প্রক্রিয়াগুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময়।’ তিনি বলেন, ‘এখানে প্রক্রিয়া বলতে নির্দিষ্ট কোনো শান্তি উদ্যোগ থেকে শুরু করে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি — যেটি উন্নয়নাধীন বা সদ্য গৃহীত —সবই বোঝাতে পারে।’
কারা মনোনয়ন দিতে পারেন?
হাজারো মানুষ পুরস্কারের জন্য নিজ পছন্দের ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছেন — সরকার ও সংসদের সদস্য, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন ও দর্শনের অধ্যাপক এবং সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩১ জানুয়ারি। কমিটির সদস্যরাও নিজেদের মনোনয়ন দিতে পারেন —ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বৈঠকের আগেই। সব মনোনয়নের তালিকা ৫০ বছর তালাবদ্ধ ভল্টে রাখা হয়।
এর অর্থ, ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
কমিটি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
কমিটি সব মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা করে প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর প্রতিটি প্রার্থীকে কমিটির স্থায়ী উপদেষ্টা ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করেন।
কমিটি সাধারণত মাসে একবার বৈঠক করে। হারপভিকেনের মতে, সিদ্ধান্ত সাধারণত আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে নেওয়া হয়।
কমিটি চেষ্টা করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। তা সম্ভব না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়।
প্রতিবাদ জানিয়ে কমিটি ছাড়ার শেষ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৪ সালে। সে বছর ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত, ইসরায়েলের শিমন পেরেস ও ইজহাক রাবিন যৌথভাবে পুরস্কার পাওয়ায় এক সদস্য পদত্যাগ করেন।
বিজয়ী কী পান?
একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ, ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ ডলার) এবং সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী নজরকাড়া পরিচিতি।
ঘোষণা দেওয়া হয় কখন, পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় কখন?
অক্টোবরে এক শুক্রবার নরওয়ের অসলো শহরের নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা দেন কমিটির চেয়ারম্যান।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হয় ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে, অসলো সিটি হলে।



