ইরান-আমেরিকা চুক্তি নিয়ে সিএনএন

যাঁকে নিয়ে কটুক্তি করলেন, সেই ওবামার চেয়েও কম পাচ্ছেন ট্রাম্প?

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

পার্থক্যগুলো চোখে পড়ার মতো।

একজন প্রেসিডেন্ট বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি। বারাক ওবামা এবং একটি বড় আন্তর্জাতিক জোট ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল, যাতে ইরান এক দশকের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখে। এ চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০১৫ সালে মার্কিন কংগ্রেসে গিয়ে ইরানের সঙ্গে সেই চুক্তি ও তৎকালীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বক্তব্যও দেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

অন্য একজন প্রেসিডেন্ট বেছে নেন যুদ্ধ। ডোনাল্ড ট্রাম্প - যিনি কয়েক বছর আগে ওবামার সেই চুক্তি বাতিল করেন, আর এবার নতুন চুক্তি করতে গিয়ে আলোচনায় তাঁর মতো করে সব না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের মতে, তিনি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহুকে ডেকে নেন। সেখানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইরানে আকস্মিক হামলার প্রস্তাব দেন, ট্রাম্প রাজিও হয়ে যান। ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা করতে চলে যায়।

এখন যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তি ছাড়া পথ নেই 

তবে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ পুরোপুরি ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। এটা ঠিক, ইরানের সামরিক শক্তি, নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় আঘাত হানতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক উপাদান এখনো তাদের দেশের ভেতরেই আছে, যদিও তা সম্ভবত মাটির নিচে রাখা আছে। তবে এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এটি যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাদের নতুন প্রভাব তৈরি করেছে।

এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সে প্রশ্নের উত্তর অজানা। শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার কথা, যে আলোচনা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে ভিত্তি করে এগোবে। তবে যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই চেষ্টা করবে চুক্তিটাকে এমনভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতে যাতে এটিকে ওবামার করা চুক্তির চেয়ে ভালো দেখানো যায় – যে চুক্তিটা কোনো যুদ্ধ ছাড়াই করে ফেলেছিলেন ওবামা।

ট্রাম্পের মস্তিষ্কজুড়ে ওবামার চুক্তি

ট্রাম্প ইরান নিয়ে কথা বলছেন আর সেখানে ওবামা ও ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে আক্রমণ করেননি – এমন খুব কমই হয়েছে। ওবামার সেই চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ)।

গত ২৬ মার্চ এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ওবামা ইরানকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে স্বাধীনতা’ দিয়েছেন এবং ইসরায়েলের চেয়ে ইরানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ৬ এপ্রিলের এক সংবাদ সম্মেলনেও তিনি একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি না এলে ‘খারাপ’ ওই চুক্তি বাতিল হতো না এবং সেটি ইরানের জন্য ‘পারমাণবিক অস্ত্রের পথ’ তৈরি করছিল।

ট্রাম্প প্রায়ই বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময় ইরানে ৪০ কোটি ডলার নগদ পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেটা তো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ছিল না, সেটা আসলে ছিল বহু বছর আগে জব্দ হওয়া ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া। সেই অর্থও ফেরত দেওয়া হয়েছিল চুক্তি এবং কারাবন্দি আমেরিকানদের মুক্তির শর্তের সঙ্গে মিলিয়ে।  

সেই অর্থের তুলনায় এখন যুদ্ধ শেষে ইরান কী পরিমাণ অর্থ পেতে পারে? হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের টোল, অবমুক্ত সম্পদ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে পাওয়া আয় মিলিয়ে এবার ইরান যে অর্থ পেতে পারে, তার পরিমাণ ওবামার সেই চুক্তির সময়ের অর্থের চেয়েও অনেক বেশি হওয়ার জোর সম্ভাবনা!  

জেসিপিওএতে কী ছিল?

জেসিপিওএ একটি জটিল কূটনৈতিক চুক্তি ছিল। এতে ইরান, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য —যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য — এবং জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অংশ নেয়।

চুক্তির মূল কাঠামো ছিল — ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করবে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমাবে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ইরানে ঢোকার অনুমতি দেবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থাকা কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করা হবে।

এই চুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কিত ছিল। নেতানিয়াহু এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ২০১৫ সালে কংগ্রেসে গিয়ে এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।

২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন। পরে অন্য দেশগুলো চেষ্টা করলেও চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। যদিও জো বাইডেন প্রশাসন ও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ — উভয় সময়েই আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা হয়েছে।

গত এক দশকে অনেক কিছু বদলে গেছে

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ড্যারিল কিমবলের মতে, জেসিপিওএ ছিল ভিন্ন এক সময়ের চুক্তি।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে একমত ছিল যে, চুক্তি চলাকালে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা দেখা যায়নি এবং তারাও শর্তগুলোও মেনে চলছিল। যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল।

চুক্তি ছাড়ার পর ইরানের কর্মসূচি বেড়েছে

ইসরায়েলের চাপের মুখে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। এর এক বছর পর দেখা যায়, ইরান আবার সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করেছে। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায় এবং নতুন স্থাপনা তৈরি করে। তবে তারা দাবি করে, তারা ১৯৭০ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি মানছে।

ড্যারিল কিমবলের মতে, ভবিষ্যতের কোনো চুক্তি জেসিপিওএর মতো হবে না, তবে কিছু মিল থাকবে — বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের বিষয়টি।

ট্রাম্প তো আরও কয়েক ডিগ্রি এগিয়ে দাবি করছেন। তাঁর চাওয়া, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে এবং বর্তমানে যে ইউরেনিয়ামের মজুত আছে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে।

এখন ইরানের হাতে নতুন ‘অস্ত্র’

বর্তমান এই যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্ব জ্বালানির বড় অংশ পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষক ফারিদ জাকারিয়ার মতে, এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

সাবেক সিআইএ পরিচালক ডেভিড পেট্রেয়াস বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে হলে প্রথম শর্তই হবে এই প্রণালি খুলে দেওয়া।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের কিছু দাবি ইরান করছে, যেগুলো আমেরিকার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আরও অন্য কিছু বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

হরমুজ দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় করলে ইরান বড় অঙ্কের অর্থ পেতে পারে, যা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

যুদ্ধের আগে কি সমাধান সম্ভব ছিল?

ট্রাম্প ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানে হামলা চালান, কারণ তিনি মনে করেছিলেন আলোচনায় অগ্রগতি নেই। তবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি বলেছিলেন, যুদ্ধের আগে আলোচনার সময়েই ইরান বড় ছাড় দিতে রাজি ছিল।

তিনি বলেন, ইরান ইউরেনিয়াম মজুত কমাতে ও কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া মানতে প্রস্তুত ছিল।

ট্রাম্পের দলের ভিন্ন মত

যুদ্ধপূর্ব সেই আলোচনার সময়ে ট্রাম্পের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ বলেন, ইরান সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে রাজি নয় এবং তারা কূটনীতিতে এমন কিছু ছাড়বে না, যা যুদ্ধেও অর্জন করা যায়নি।

কিমবলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যাওয়া আলোচকেরা হয়তো পুরোপুরি বুঝতেই পারেননি যে, ইরানের প্রস্তাবের গুরুত্ব আসলে কতটা।

এখন নতুন করে ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হচ্ছে, যেখানে উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে যোগ দেবেন।

সামনে কী?

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে। ইরান বলছে, তারা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখে।

চুক্তির বিনিময়ে তারা যেমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাইবে, তেমনি এখন নতুন করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতিও চাইতে পারে। এতে আগের তুলনায় ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যেতে পারে।

কয়েক সপ্তাহের নাটকীয়তার পরেও নিজেদের দূরত্ব দূর করতে পারেনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার মাঝেও দুই দফা হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন,...
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর শান্তি চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর...
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। শুক্রবার থেকেই খুলছে হরমুজ প্রণালি। আর এতেই ওলটপালট হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। বড় ধাক্কা...
ইরান ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। ট্রাম্পের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, লেবাননে এই হামলার প্রকৃত...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর