জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে এটাই ছিল তাঁর প্রথম সফর।
জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ, ১১ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা—এর পাশাপাশি সফরের মধ্যেই সামনে এসেছে বোয়িংয়ের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা।
প্রথম জাতিসংঘ সফর, নজর ছিল অনেক
২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছে চার কর্মদিবসে তারেক রহমান অংশ নেন মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে। এর মধ্যে ছিল ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবার ভাষণ দেন তিনি। আন্তর্জাতিক শান্তি, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজ এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রাতরাশেও অংশ নেন।
রোহিঙ্গা ও জলবায়ু—বাংলাদেশের দুই বড় বার্তা
রোহিঙ্গা সংকট ছিল সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিষয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংকটের টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন।
জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য রূপান্তর নিয়েও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তারেক রহমান।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ—রোহিঙ্গা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার—এসব বিষয় সামনে রাখাই ছিল সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
বৈঠকের ব্যস্ততায় অর্থনীতি ও কূটনীতি
কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
আলোচনায় আসে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনারসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও হয় প্রাতরাশ বৈঠক। সেখানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বোয়িংয়ের ১১ বিমান ও পারমাণবিক সহযোগিতা
সফরের সময় সবচেয়ে আলোচিত অর্থনৈতিক ঘোষণাগুলোর একটি—বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি।
বোয়িং জানিয়েছে, এর মধ্যে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। এপ্রিলের ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে এ বছর বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের পরিকল্পিত ক্রয় দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে। নতুন ১১টির মূল্য, অর্থায়ন ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রও চুক্তিটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে।
আর সফরের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা সই করে। সমঝোতায় পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সেফগার্ডস ও নন-প্রলিফারেশনের উচ্চ মান বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ
সফর চলাকালেই নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ আসে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানে পৌঁছাবে—এমন আশা প্রকাশ করে ওয়াশিংটন।
একই ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপের পরামর্শ দেবে না; আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা বা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়।
তবে এই বক্তব্যগুলোকে তারেক রহমানের সফরের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দেখানোর তথ্য নেই। এগুলো ছিল সফর চলাকালে অনুষ্ঠিত আলাদা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ের বক্তব্য।
সফর নিয়ে বিশ্লেষকরা যা বলছেন
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, সাধারণ পরিষদ, সাইডলাইন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে রোহিঙ্গা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও ক্লাইমেট জাস্টিসের মতো বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, সরকার গঠনের পর এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের প্রথম সফর; তাই বিভিন্ন ইস্যু একসঙ্গে সামনে আনার প্রয়োজন ছিল।
অন্য সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো এসেছে এবং নতুন সরকার কী ধরনের সহযোগিতা আশা করছে, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কী পেল বাংলাদেশ?
সব মিলিয়ে সফরে দৃশ্যমানভাবে এসেছে ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা। কিন্তু এগুলো কতটা বাস্তব সুফলে পরিণত হবে, তার হিসাব এখনই করা কঠিন।
বোয়িংয়ের নতুন উড়োজাহাজ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, পারমাণবিক সহযোগিতা কতটা বাস্তব প্রকল্পে যায়, বৈঠকগুলোর পর বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে কী অগ্রগতি হয় এবং রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থন কতটা কার্যকর হয়—এসবের ওপরই নির্ভর করবে তারেক রহমানের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরের দীর্ঘমেয়াদি ফল।


