মাত্র একশ মাইল চওড়া এক সমুদ্র। কোনো গোলাগুলি নেই, কোনো ধ্বংসস্তূপ নেই — তবু তাইওয়ান প্রণালিতে প্রতিদিন একটা যুদ্ধ চলছে, নিঃশব্দে। চীনের যুদ্ধবিমান রোজ সীমান্ত রেখা পেরোয়, জাহাজ থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ হয় — যা একসময় সংকট ছিল, আজ তা নিছক রুটিন।
বেইজিংয়ের আসল অস্ত্র ভয় দেখানো নয়, বিশ্বকে অভ্যস্ত করে তোলা। আর এই ‘ধূসর যুদ্ধ’ হঠাৎ আইনি চেহারা নিয়েছে — ২৮ আগস্ট সংশোধিত এক আইনে চীন এখন যুদ্ধ শুরুর আগেই বেসামরিক জাহাজ-কারখানা চিরতরে দখলে নেওয়ার বৈধতা পেয়েছে, যা কার্যকর হবে ১ অক্টোবর থেকে।
কী আছে চীনের নতুন আইনে?
১ অক্টোবর কার্যকর হতে যাওয়া চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন আইনের সংশোধনীতে যুক্ত হয়েছে ‘উন্নয়নমূলক স্বার্থ’ শব্দটি, যার মাধ্যমে সংঘাত শুরুর আগেই সরকার বেসামরিক সম্পদ ব্যবহারের বৈধতা পাবে।
আগের ‘সাময়িক অধিগ্রহণ’ শব্দের বদলে বসেছে ‘স্থায়ী দখল’ — অর্থাৎ পিপলস লিবারেশন আর্মি এখন যেকোনো বেসামরিক জাহাজ, ড্রোন কারখানা বা সম্পদ চিরতরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় শিপিং কোম্পানি কসকোর ৪৬৪টিরও বেশি কনটেইনার জাহাজ বিশ্বজুড়ে সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে— যদিও চীন ও কসকো উভয়ই তা অস্বীকার করেছে।
তাইওয়ানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক গবেষককে সম্প্রতি চীনের হয়ে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। লক্ষ্য — তাইওয়ানের জনগণের মাঝে সরকার ও সামরিক বাহিনীর প্রতি আস্থা কমিয়ে দেওয়া।
তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর
তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় শক্তি একটা শব্দে বলা যায় — সেমিকন্ডাক্টর। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপের প্রায় ৯০ শতাংশ তৈরি হয় এই দ্বীপে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক গবেষণাপত্রে সরাসরি প্রস্তাব করা হয়েছে, চীন আক্রমণ করলে তাইওয়ান যেন নিজ হাতেই তার চিপ কারখানা ধ্বংস করে দেয়, যাতে দ্বীপটা চীনের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হয়ে ওঠে। এই ধারণার নাম ‘ব্রোকেন নেস্ট’ — নিজের হাতে নিজের সোনার ডিম ভাঙার পরিকল্পনা।
ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েন প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কখনোই এই কারখানাগুলো চীনের হাতে পড়তে দেবে না — এমনকি প্রয়োজনে ধ্বংস করেও। আর প্রতিরক্ষা নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এক শীর্ষ মনোনীত ব্যক্তি এলব্রিজ কলবি প্রকাশ্যেই লিখেছেন, চীন তাইওয়ান দখল করলে চিপ কারখানা ধ্বংস করা অবশ্যকরণীয়।
অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান শিল্প-সম্পদ শুধু তাইওয়ানের ঢাল নয়— প্রয়োজনে তা হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্ব-ধ্বংসাত্মক অস্ত্রও।
বড় জাহাজগুলোই এখন তাইওয়ানের বোঝা
তাইওয়ানের নৌবহরের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বিশাল ধূসর ডেস্ট্রয়ার আর ফ্রিগেট — জাতীয় গর্বের প্রতীক। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই গর্বই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। উপগ্রহ, ড্রোন আর নিখুঁত-নিশানার মিসাইলের যুগে একটা বিশাল জাহাজ সমুদ্রের বুকে ভাসমান এক বিশাল লক্ষ্যচিহ্ন। দূর থেকেই দেখা যায়, দূর থেকেই ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাইওয়ানের উচিত ‘সি ডিনায়াল’ কৌশল নেওয়া —চীনকে সরাসরি হারানো নয়, বরং তাদের জন্য প্রণালি পার হওয়াকে এমন দুঃস্বপ্নে পরিণত করা যে আক্রমণের চিন্তাই যেন গলা শুকিয়ে দেয়। এর জন্য দরকার ছোট, রাডার-ফাঁকি দিতে সক্ষম বহু কর্ভেট, উপকূলে লুকানো মোবাইল মিসাইল লঞ্চার আর সাবমেরিন।
হিসাবটাও চমকে দেওয়ার মতো — একটা বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে খরচ প্রায় ২০০ কোটি ডলার, সেখানে একটা ছোট মিসাইল বোট তৈরি হয় ২০ কোটি ডলারেরও কমে। মানে একটা বড় জাহাজের দামে গড়া যায় দশটির বেশি প্রাণঘাতী ছোট জাহাজ।
আমেরিকা কি সত্যিই আসবে?
আর এখানেই আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা। ১৯৯৫-৯৬ সালের সংকটে যুক্তরাষ্ট্র দুটো বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে চীনকে সরাসরি বার্তা দিয়েছিল। তখনকার এক সাবমেরিন কমান্ডার
বলেছিলেন, তিনি ভয় পাননি — কারণ পেছনে ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ছায়া। আজ সেই একই মানুষ স্বীকার করেন, সেই আত্মবিশ্বাস আর অবশিষ্ট নেই।
কেন? কারণ ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে, এশিয়া থেকে যুদ্ধজাহাজ সরে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। তাইওয়ানের বহু আগে কেনা অস্ত্রের চালান বছরের পর বছর ধুলো জমছে কারখানার সারিতে। যে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে প্রকাশ্যে ‘মহান বন্ধু’ বলে ডাকেন, তার কাছ থেকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষায় দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতি আশা করা এখন মরীচিকার পেছনে ছোটার মতোই।
সাম্প্রতিক জরিপে তাইওয়ানের চারভাগের একভাগেরও কম মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বাসযোগ্য মিত্র’ মনে করেন, আর মাত্র ৩৫ শতাংশ বিশ্বাস করেন চীনা আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই এগিয়ে আসবে।
এই আস্থার ধস তাইওয়ানের ভেতরেই তৈরি করেছে গভীর বিভাজন — একদল বলছে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে হবে আরেক দল বলছে প্রতিরোধ গড়া নিরর্থক, চীনের সঙ্গে সমঝোতাই একমাত্র বাস্তবতা।
রাখাল বালকের সেই পুরোনো গল্প মনে আছে? বারবার মিথ্যা চিৎকার করে গ্রামবাসীদের ডেকে আনা? তাইওয়ানের ভয় আজ ঠিক উল্টো — সত্যি বললেও কেউ বিশ্বাস করবে কিনা, সেই আতঙ্কে সে জেগে থাকে। কিন্তু গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি। ইতিহাস বলে, যে জাতি নিজের নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে অন্যের দয়ার ওপর ছেড়ে দেয়, সে-ই সবচেয়ে বড় মূল্য দেয়।
তাইওয়ানের সামনে আসল প্রশ্ন তাই আর ‘আমেরিকা আসবে কিনা’ নয় — বরং তারা নিজেরা কতটা প্রস্তুত হতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ।



