কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার কাঁচাবাজার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁচা শাকসবজি ফলমূল কেনাকাটার বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন কোটি টাকার কাঁচামাল কেনাবেচা হয়ে এই বাজারে। সারা দেশ থেকে শত শত ট্রাক পিকআপ ভ্যান দিয়ে পণ্য আসা-যাওয়া করে নিমসার থেকে।
বাজারের নির্ধারিত জায়গা জেলা প্রশাসন থেকে ইাজার নেওয়া থাকলেও বাড়তি টাকার লোভে টোকেনের নামে মহাসড়কের ওপর বসানো হয় বাজার। এই টোকেনের টাকার লোভেই বার বার উচ্ছেদ করলেও আবার সড়কের ওপরই বসানো হয় দোকানিদের বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
যানজটের ভোগান্তি থাকলেও শুধু নিমসার বাজারেই মহাসড়কের ওপর বাজার বসিয়ে যানবাহনের ‘দৈনিক নিমসার কাঁচাবাজার’ খাজনা টোকেন দিয়ে থেকে প্রতিদিন উত্তোলন হয় লক্ষাধিক টাকা। অথচ এই টোকেন শুধু ব্যবহার করার কথা বাজারের ভেতরে।
অভিযোগ রয়েছে, এই টাকা থেকে একটি অংশ ব্যয় হয় প্রশাসন ম্যানেজে।
২ মার্চ সোমবার সকালে নিমসার কাঁচা বাজারের নিমসার জুনাব আলী কলেজ গেইটে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস বে পুরোটা দখল করে আছে আঁড়তদাররা।
মহাসড়কের যে অংশে নিরাপদে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে ট্রাক থেকে বিক্রি হচ্ছে আলু, বেগুন, পেঁয়াজ।
খাজনার নামে এসব ট্রাক প্রতি ৫০০ টাকা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়িরা। এছাড়া সেখানে রাখা ক্রেতাদের পিকআপ, সিএনজি, অটোরিকশা থেকে নেওয়া হয় মালামালের পরিমাণ ভেদে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে ৪০০ টাকা।
বগুড়া থেকে আসা এক আলু ব্যবসায়ী ওবায়দুল (ছদ্মনাম) জানান, প্রতিবার ট্রাক রেখে আলু বিক্রির জন্য প্রতি ট্রাকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। আড়তদার ট্রাক থেকে আলু না নামিয়ে হাইওয়ের পাশে ট্রাকে রেখেই বিক্রি করে। এতে সুবিধা হলো যাকে সামনে আগে পায় তার কাছ থেকে ক্রেতারা আগে কিনতে চায়।
ওবায়দুল বলেন, ‘বাজারের ভেতরে ইজারার টোকেন দিয়ে টাকা তোলা যায়, কিন্তু হাইওয়েতে আমরা বসলে তো টাকা দিতেই হবে। কিন্তু জায়গা থাকলে বাজারের ভেতরেই যাওয়া উচিত।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ি আমিনুল বলেন, ‘আমি সিএনজি নিয়ে এসেছি। সিএনজি বাজারে রাখার জায়গা নাই, তাই হাইওয়ের উপরে রেখেছি। ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।’
আমিনুল বলেন, ‘কখনো টাকা দিতে না চাইলে ইজারাদারদের লোকজনের মারধর ও গালাগালির শিকার হতে হয়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাসড়কের উপরে দাঁড়ানো প্রতিদিন অন্তত তিন শতাধিক যানবাহন থেকে ইজারার নামে টাকা তোলা হয়। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অতিরিক্ত টাকার লোভেই মহাসড়ক দখল করে অবৈধ স্থাপনাও গড়ে উঠে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এমনকি সম্প্রতি সড়ক থেকে ইজারার নামে চাঁদা তোলার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।
বুড়িচং উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলা বছরে এক বছরের জন্য হুমায়ুন কবির নামে এক ব্যক্তি ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন নিমসার বাজার। বর্তমানে তিনি এবং তার লোকজনই এই বাজার থেকে খাজনা আদায় করেন। এই চৈত্র মাসে শেষ হবে তার মেয়াদ। তবে ইজারাদার পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয় না বাজারের চিত্র। অবৈধ টাকার লোভে মহসড়ক বিশৃঙ্খল করেই বসানো হয় দৈনিক বাজার।
এ বিষয়ে জানতে বাজার ইজারাদার হুমায়ুন কবিরের মুঠোফোনে বার বার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
বাজার ইজারা দেওয়া বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর হোসেন বলেন, ‘আইনিভাবে বলতে গেলে কেউ মহাসড়কে বাজার বসাতে পারবেন না এবং সেখান থেকে কোনো টাকাও তুলতে পারবেন না। ক্রেতা বিক্রেতাদের চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন না হলে এই দশা প্রতিদিনই হবে।’
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘বাজারের নির্ধারিত জায়গার বাইরে ইজারা তোলার সুযোগ নাই। মহাসড়কের উপর যদি কেউ বাজার বসিয়ে টাকা তোলে সেটি অন্যায়। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘কাছাকাছি সময়ে আমরা বেশ কয়েকবার নিমসার বাজার উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু তারা আবার বসে যায়। মানুষ এখানে সচেতন না হলে আমরা যতই চেষ্টা করি- লাভ হবে না। আর ইজারার নামে যে টাকা মহাসড়ক থেকে টাকা উঠে তা বেআইনি। সড়ক বিভাগের কেউ এই অবৈধ টাকার অংশীদার নয়, কেউ বলে থাকলে সেটি মিথ্যা।’
হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সকল বাজার এলাকাগুলোতেই থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। নিমসার এলাকায় সড়কের উপর যে বাজারে এসেছে- তার দেখভাল করবে উপজেলা প্রশাসন। সাধারণত ভোররাত থেকে সকালবেলা পর্যন্ত নিমসার বাজার এলাকায় ভিড় থাকে। আমরা চেষ্টা করি সেখানে পুলিশ মোতায়েন রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে। তবে আমাদের নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমরা সেটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।’



