‘কত আদরের ছেলে আমার। ঋণ করে ছেলেডারে পড়াইছি। অহনো ঋণও শেষ করছি না। আমার ছেড়াডা দুইদিন আগেও ফোন কইর্যা কইতাছে আম্মা রোজা রাইখ্যো। আমি রাখছি। আমরার এইহানে কিছুক্ষণ পরেই ইফতার।’— কাঁদতে কাঁদতে এরকম আগের স্মৃতিকথা বিলাপ করছিলেন জলদস্যুদের হাত জিম্মি নাবিক রোকেন মা লুৎফুন্নাহার বেগম।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলেকে ভিক্ষা চেয়ে তাঁর আকুতি, ‘আমার রোকনরে আমার কোলে ফিরাইয়া দেইন। আরও যারা আছে তাদেরও ফিরাইয়া আনেন। আমার মতোই তারার মায়েরাও কানতাছে।’
রোকনের মা আহাজারি করছিলেন আর কিছু সময় পর পর মুর্ছা যাচ্ছিলেন। বাবা মিরাজ আলী অসুস্থ। তিনি কথা বলার অবস্থায় নেই।
সোমালিয়ায় জলদস্যুদের কবলে পণ্যবাহী জাহাজে আটকাপড়াদের মধ্যে রয়েছেন নেত্রকোণা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোণা ইউনিয়নের বাঘরোয়া গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন। দিনমজুর বাবা মিরাজ আলী ও মা লুৎফুন্নাহার বেগমের ৫ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সন্তান রোকন। জলদস্যুদের কবলে সন্তান আটকা পড়ায় শঙ্কা আর উদ্বেগে সময় কাটছে রোকনের পরিবারের সদস্যদের।
রোকনের বোন শাহীমিনা আক্তার জানান, রোকন সর্বশেষ স্ত্রী তানিয়া আক্তারের সঙ্গে কথা বলে। জলদস্যুরা তখন জাহাজটিকে ঘিরে ফেলেছে জানিয়ে রোকন তার স্ত্রীকে জানায়, জলদস্যুরা তাদের মোবাইল নিয়ে যাচ্ছে, আর হয়তোবা ফোনে কথা বলা যাবে না। এরপর পরই তাকে ফোনে আর পাওয়া যায়নি। গতকাল খবর পাওয়ার পর থেকে বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ। কারও মুখ দিয়ে খাবার নামছে না।
রোকনের বড়ভাই দিনমজুর সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কালকার আগের দিন রাইতে কথা অইছে। ভালাই আছে কইছে। আর কথা অয় নাই। ভাইয়ের কোনো খোঁজ–খবর পাইতাছি না। এইবায় আমরাতো ভালা নাই। কাইল রাইত থেইক্যা বাড়ির কেউরই খাওয়া নাই। পেডে দিয়া কি আর খাওয়া নামে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য একলাছ মিয়া বলেন, ‘ছেলেটা খুব ভালা। আমরা এলাকার সব মানুষের মন খারাপ। খবরডা পাওয়ার পর থেকে এলাকার সবাই রোকনদের বাড়িতে ভিড় করছে। রোকনকে আমরার মাঝে সুস্থভাবে ফিরে পেতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরার আকুল আবেদন, আমরার ছেলেরে যেন ভালামতোই ফিরাইয়া আনেন।’
গতকাল মঙ্গলবার ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। জাহাজটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপ। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জাহাজটিতে যে ২৩ জন নাবিক রয়েছে তারা সবাই বাংলাদেশি। এর মধ্যে ১১ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। নোয়াখালীর দুজন। বাকিরা ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, খুলনা, নেত্রকোনা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বরিশালের।



