রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব না মেলায় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজন ও মামলার বাদীপক্ষ। তাদের দাবি, শুরু থেকেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক সেবনের যে বিষয়টি সামনে এসেছে, ডোপ টেস্টের ফল তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সোমবার বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মামলার বাদী ও নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।
অন্যদিকে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দুই দিন তিন ঘণ্টা করে মোট ছয় ঘণ্টা জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। সে অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার দুপুরে তিন সদস্যের একটি ডিবি পুলিশের টিম জেল গেটে যান আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের করতে। ডিবির দলটি জেলগেটে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। আগামীকাল বুধবারও একইভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী আদালতের দেওয়া অনুমতি অনুযায়ী জেলারের সঙ্গে সমন্বয় করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
এই মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘মাদক সেবন করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলে আসামিরা নেশাগ্রস্ত থাকার কথা। কিন্তু ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এতে বিষয়টি নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের বক্তব্য–মাদক খেয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটালে তারা নেশাগ্রস্ত থাকত। এখন যেহেতু মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি, তাই হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে সুস্থ মস্তিষ্কে করা হয়েছে কিনা, সেটিও গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার।’
তিনি জানান, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, সেটি তদন্ত করে বের করাই তাঁর প্রধান দাবি। তিনি নিজে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রামে থাকেন। তাই স্থানীয় পরিস্থিতি বা নিহতদের বাড়ির আশপাশের লোকজন সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ ধারণা নেই। এ কারণে কাউকে সন্দেহ করা বা কারও নাম বলার মতো তথ্যও তার কাছে নেই।
গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধই চারজনকে হত্যা করেছেন কিনা, নাকি তাদের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত-এমন প্রশ্নে গোপীনাথ বলেন, ‘শুরু থেকেই আমি বলে আসছি–এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড এই দুই যুবকের পক্ষে সম্ভব কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমার মতে, একজনের পক্ষেও হত্যাকাণ্ড সম্ভব বলে অনেকে দাবি করলেও তদন্ত কর্মকর্তাদের আরও গভীরে গিয়ে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে হবে।’
গোপীনাথ আরও বলেন, ‘একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়ে হালকাভাবে এই হত্যাকাণ্ড শেষ করা যাবে না। প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রেপ্তার দুই যুবকের বাইরে আর কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাতিজি জামাই বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘আসামিদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি না মেলায় তদন্তের আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার কারণ হিসেবে বলা হলেও ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাই দুই আসামির সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কিনা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘যতই দিন যাচ্ছে, ততই এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসছে। শুরুতে শুনেছিলাম, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এখন পরীক্ষায় মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আমরা চাই, সব দিক খতিয়ে দেখে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক।’
নিহতের ভাতিজি সপ্তমী চক্রবর্তী বলেন, ‘ডোপ টেস্টের বিষয়টি নিয়ে আমরা কিছুটা বিস্মিত। তবে তদন্তের ফলাফল যাই হোক, আমাদের মূল দাবি দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।’
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে গত রোববার জেলগেট থেকেই দুই আসামির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষা করে তাদের শরীরে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ডোপ টেস্টে মাদক সেবনের প্রমাণ মেলেনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসনের অনুরোধে নিরাপত্তার কারণে জেলগেটে ডোপ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ নিরাপত্তায় দুই টেকনোলজিস্টকে সেখানে পাঠানো হয়। তারা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা শেষে ফলাফল সিলগালা করে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেন।’
তিনি বলেন, ‘এমফিটামিন দীর্ঘদিন রক্ত বা মূত্রে থাকে না। সাধারণত মূত্রে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত এর উপস্থিতি পাওয়া যেতে পারে। এর বেশি সময় পার হলে তা আর শনাক্ত নাও হতে পারে। যেহেতু দুই আসামি গ্রেপ্তারের পর সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন এবং এ সময়ে মাদক গ্রহণের সুযোগ ছিল না, তাই ডোপ টেস্ট নেগেটিভ আসাটাই স্বাভাবিক।’
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।
পরে একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।


অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবা-ভাইকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, মুচলেকায় মুক্ত
রংপুরে চার খুনের আলামত ধুয়েমুছে ফেলা হয়নি: পুলিশ কমিশনার
রংপুরে একই পরিবারের চার খুনে ধর্ষণের আলামত মেলেনি: ডিবি
