বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় ভাসছে গোটা বিশ্ব। এবারের আসরে দুর্দান্ত সেভ করে একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন বেশ ক’জন গোলকিপার। রোববার (২১ জুন) মধ্যরাতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নেমে গোলশূন্য ড্র করেছে ইরান। আর সেই ম্যাচের নায়ক ছিল দেশটির দীর্ঘদিনের গোলকিপার আলিরেজা বেইরানভান্দ। তাঁর গ্লাভসে আটকে যায় ব্রুইনা-লুকাকুরা। অবিশ্বাস্য ৭টি সেভ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় তিনি। যদিও বিশ্বফুটবলে তাঁর শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না, প্রতি পদে পদে ছিল সংগ্রাম। সেই চিত্র উঠে এসেছে ইরানি নির্মাতা মুর্তেজা আলি আব্বাস মিরজাই পরিচালিত ‘বেইরো’ নামের একটি চলচ্চিত্রে। এটি মূলত আলিরেজার বায়োপিক।
সিনেপর্দায় কিশোর আলিরেজার এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতা। যেখানে উঠে এসেছে জন্মস্থান ইরানের লোরেস্তান অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম সারাব-ই-ইয়াস থেকে শুরু করে ২০১১ সালে ‘নাফত তেহরান’ ক্লাবে এই গোলকিপারের যোগ দেওয়ার পর্ব।
লোরেস্তান পর্বতের কুর্দি লাক যাযাবর পরিবারে জন্ম আলিরেজার। অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে ছোটবেলা। বাবা তাঁর ফুটবল খেলার বিরুদ্ধে ছিলেন। পরিবারের কাছে ফুটবল ছিল বড়লোকদের খেলা, যা কিনা তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে বড় ঝুঁকি নেন আলিরেজা। টাকা ধার নিয়ে পালিয়ে তেহরানের বাসে চেপে বসেন!

ইরানের রাজধানীতে পৌঁছনোর পর ঘর, বিছানা, বন্ধু, পরিচিত কেউই ছিল না তাঁর। মাসের পর মাস স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের বাইরে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন। খাবারের সন্ধানে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, গাড়ি ধোঁয়া, টায়ার পরিষ্কার করার মতোও কাজ করেছেন। এ ছাড়াও দিনে ফুটবল খেলার পর, রাতের পর রাত জেগে পিৎজার দোকানে কাজ করেছেন। সেই সময় তাঁর শরীরের বিশেষত্ব নজর কাড়ে কোচদের। ধীরে ধীরে খুলতে থাকে ভাগ্যের চাকা!
এক সাক্ষাৎকারে নির্মাতা আলি আব্বাস জানান, সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ক্রীড়ানির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের ওপর গবেষণার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আলিরেজাই তাঁর চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
তিনি বলেন, ‘কারণ তিনি (আলিরেজা) এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর কোনো অর্থ কিংবা রাজদরবারে কোনো বন্ধু ছিল না, আর তিনি নিজের সমস্যার জন্য কখনও অন্য কাউকে দোষারোপ করেন না।’

২০২২ সালে ইরানের ৪০তম ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে বেইরো’র প্রিমিয়ার হয়। আমেরিকার ‘নেক্সট জেনারেশন ইন্ডি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস’র ন্যারেটিভ ফিচার বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করেছে সিনেমাটি। এতে অভিনয় করেছেন হোসেইন বেইরাভান্দ, মেহরান নায়েল ছাড়াও আরও অনেকে।
বিশ্ব ফুটবলে ‘দ্য এক্সিডেন্টাল গোলকিপার’ হিসেবে পরিচিত আলিরেজা বেইরানভান্দ। তাঁর বয়স যখন প্রায় ১২ বছর, তখন তিনি স্থানীয় একটি দলে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা শুরু করেন। একটি ম্যাচে তাঁর দলের গোলরক্ষক ইনজুরিতে পড়েন। অন্যকোনো বদলি খেলোয়াড় না থাকায়, শেষমেশ গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ান আলিরেজা। সেই ম্যাচেও তিনি দুর্দান্ত সেভ করেন, যা তাঁকে স্থায়ীভাবে গোলকিপিংয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন।
শুধু বেলজিয়ামের বিপক্ষেই নয়, বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই আলোচনায় ছিলেন ইরানের এই ৩৩ বছর বয়সী গোলকিপার। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দুটি গিনিস বুক রেকর্ড। ফুটবলে সবচেয়ে বড় থ্রো করার কীর্তি তাঁরই। ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এই রেকর্ড করেন তিনি। ২০০.১৪ ফিট, অর্থাৎ ৬১.০০২ মিটার দূরে বল ছোড়েন। অন্যটি হলো ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘতম ড্রপ কিক, যা ২৫৫.৯৫ ফুট (৭৮.০১৪ মিটার)। ২০১৯ সালে নিজ দেশের একটি পেশাদার ফুটবল ম্যাচে এই অবিশ্বাস্য ড্রপ-কিকটি নিয়েছিলেন তিনি।
সূত্র: তেহরান টাইমস


ধানুশ-ম্রুণালের সম্পর্কে ইতি?
