
আমাদের বঙ্গ তল্লাটে মাঝেমধ্যেই একটি খবর পত্র–পত্রিকার পাতায় মিলত। তাতে শিরোনাম থাকত—‘বোমা বানাতে গিয়ে হাত উড়ে গেল অমুকের’ বা ‘বোমা বানাতে গিয়ে পঙ্গু হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণভাবে হাত দিয়ে বানানো বোমার ক্ষেত্রে সেটির হস্তসংহারী রূপই সবার মাথায় আসে আগে। তাই হাত-পায়ের ক্ষতির বিষয়টি মেনেই নেওয়া হয়। কিন্তু বোমা বানানোর কারিগরের যদি বোমার বিস্ফোরণে মন উড়ে যায়, তখন?
তেমনটাই হয়েছে ‘ওপেনহাইমার’ ছবিতে। পরিচালক হিসেবে ক্রিস্টোফার নোলান বেশ ভারী নাম। সেই ভার ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতেও অনুভূত হয়েছে ভালোই। পরমাণু বোমার জনক হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত বিজ্ঞানী জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমারের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। স্বাভাবিকভাবেই এতে যেমন পরমাণু বোমা বানানোর ঘটনা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি, তেমনি ওপেনহাইমারের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা ঘটনাও উঠে এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবেই।
সত্য ঘটনা বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ঐতিহাসিক সত্য ও নৈর্ব্যক্তিকতার সঙ্গে ফিকশনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক। ‘ওপেনহাইমার’ বানানোর ক্ষেত্রে তাই হয়তো ২০০৬ সালে পুলিৎজার পুরস্কার জেতা ‘আমেরিকান প্রমিথিউস: দ্য ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি অব জে. রবার্ট ওপেনহাইমার’ নামের বইটিকেই প্রামাণ্য উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে নেন পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান। এতে বেশ লাভও হয়েছে। অন্তত বাস্তবের সঙ্গে খুব বেশি অমিলের অভিযোগ তোলা কঠিন হয়ে গেছে।

সিনেমার শুরুটা হয় ব্যক্তি ওপেনহাইমারের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার যাত্রা দেখানোর মধ্য দিয়ে। অবশ্য দৃশ্যের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ঘটনার ধারাবাহিকতা সব সময় সঙ্গত দেয়নি। মাঝে মাঝেই অতীতে গিয়ে আবার বর্তমানে ফিরে আসা হচ্ছিল। যদিও পুরো সিনেমার নিউক্লিয়াস ছিল পরমাণু বোমার সৃষ্টি। এর আগে-পরের ঘটনা তাই মাঝে মাঝেই দর্শকদের কখনো ওপেনহাইমারের ছাত্রজীবনে, আবার কখনো জেরাকক্ষে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে তাতে সিনেমা দেখে যাওয়ার আগ্রহ আরও বাড়বে বৈ কমবে না। সময় নিয়ে এই লুফালুফি খেলাটা ক্রিস্টোফার নোলানের পুরোনো অভ্যাস। ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমায় সেই কাজটি তিনি সুনিপুণভাবেই করেছেন। ফলে তাল কেটে যাওয়ার কোনো সংকেতই শঙ্কা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং কখন যে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে যাবে, তা টের পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এত বিশাল দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে কখনোই দেখার আগ্রহে ভাটা পড়ে না। উল্টো সিনেমা দেখার মধ্যে পপকর্ন এগিয়ে দিলেও দর্শকদের বিরক্তির উদ্রেক হতে পারে!
‘ওপেনহাইমার’–এ পরমাণু বোমার জনকের মানসিক পৃথিবীকে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে প্রবলভাবে। ঐতিহাসিক ঘটনার চিত্রায়নের পাশাপাশি এই বিষয়টিকে ক্যামেরার চোখে অন্যতম প্রধান করে তোলার কারণেই ছবিটি উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। পরমাণু বোমা বানানোর বিষয়টি তৎকালীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যতটা না যুদ্ধ সংহারক ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের হাতিয়ার। সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণও ছিল এটি। যদিও ওপেনহাইমার ব্যক্তি হিসেবে যুদ্ধ বা রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। তিনি হতে চেয়েছিলেন নিখাদ বিজ্ঞানী, কিন্তু শেষতক তিনি হয়ে যান মৃত্যুর অপর নাম।

ওপেনহাইমার–সংশ্লিষ্ট নানা বিতর্কিত বিষয়ও ছবিটিতে উঠে এসেছে। বিশাল অংশজুড়েই ছিল বামপন্থা ও কমিউনিস্ট রাজনীতির প্রতি ইহুদি ওপেনহাইমারের আকর্ষণ এবং এর কারণে মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জেরা ও সন্দেহের বিষয়টি। এসব ক্ষেত্রে পরিচালক কোনো হাইপোথিসিস দেওয়ার চেষ্টা করেননি, ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টাটাই বরং প্রবল ছিল। এর সাথে সাথে ওপেনহাইমারের প্রেম, বিয়ে ও দাম্পত্য জীবনও তুলে ধরা হয়েছে চলচ্চিত্রে। ছিল পরমাণু বোমা তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওপেনহাইমারের মনোভাবের বিষয়টি। যে বিতর্কটি সবচেয়ে বেশি সামনে আসে, তা হলো—পরমাণু বোমা তৈরির মতো একটি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে এই বিজ্ঞানী কি আদৌ অনুশোচনায় ভুগেছেন কখনো? ছবিতে অন্তত এটুকু বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিশেষ করে, বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের সফলতা যে পুরো বিশ্বকে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং সেটি যে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে—সেটি বোঝা কঠিন কোনো ব্যাপার ছিল না ওপেনহাইমারের কাছে। তবে এটি একইসঙ্গে তাঁকে ফেলে দেয় এক বিশাল দ্বিধার সাগরে।
ওপেনহাইমারের এই মানসিক দ্বন্দ্বকে ক্যামেরার সামনে দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কিলিয়ান মারফি। সত্যিকারের ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ছবি পাশাপাশি রাখলেও যেমন কাছাকাছি মনে হয়, ঠিক তেমনি পর্দার ওপেনহাইমারকে রক্ত–মাংসের আসল মানুষটির থেকে পৃথক করাটাও কঠিন। বিজ্ঞানীর অনুসন্ধিৎসু মন, সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, প্রেমে মশগুল হয়ে যাওয়া বা হাড়ভাঙা খাটুনিতে পাওয়া সফলতার পর নাম না জানা অগণিত মানুষের রক্তে নিজের হাত লাল হওয়ার অনুভূতি—সবক’টিতেই মারফি ছিলেন অনবদ্য। এর বাইরে ওপেনহাইমারের মিত্রপক্ষ জেনারেল লেসলি গ্রোভসের চরিত্রে ম্যাট ডেমন এবং বিরোধী পক্ষ হয়ে ওঠা লুইস স্ট্রসের চরিত্রে রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই দুই হেভিওয়েট অভিনেতা এতটাই নিপুণভাবে চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তাঁদের বিকল্প কোনো অভিনয়শিল্পীর নাম আর মাথায় উঁকি দেওয়ার সাহস পায় না। ওপেনহাইমারের স্ত্রীর ভূমিকায় এমিলি ব্লন্টও ছিলেন অতুলনীয়।

তবে হ্যাঁ, ১৯৫০ সালের পর ইহুদি ওপেনহাইমারের প্রতি মার্কিন সরকারের যে আচরণ, সেটিকে ‘হয়রানিমূলক’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলার একটি চেষ্টা দেখা গেছে ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমায়। সেই সঙ্গে ওপেনহাইমারকে ওই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘নায়ক’ হিসেবে প্রতিভাত করার প্রচেষ্টাও ছিল একতরফাভাবেই। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিনেমায় অবশ্য সেটি খুব একটা অস্বাভাবিক প্রবণতা নয়। এ ক্ষেত্রে পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান অবশ্য আগেই নিজের দর্শন সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুন, আর না-ই মানুন, জে. রবার্ট ওপেনহাইমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যে বিশ্বে এখন আমরা বাস করি, সেটি তাঁরই বানানো। তা সেটা ভালোই হোক, বা খারাপ।’
এমন বক্তব্যের পর অবশ্য আর কথা বলা অবান্তর। পরিচালকের এমন বক্তব্যের সঙ্গে দর্শকেরাও যে কিছুটা একমত, তা বক্স অফিসে ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমার তুমুল ব্যবসা করা দেখেও কিছুটা আঁচ করা যায়। একই সাথে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানো ও পকেট ভরে ডলার কামানো—তুলনামূলকভাবে কঠিন কাজ। সেটিই অবলীলায় করে ফেলেছে ‘ওপেনহাইমার’। বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে এরই মধ্যে তিন শ’রও বেশি পুরস্কার জিতেছে এই সিনেমা। এবারের অস্কার আসরেও পেয়েছে সর্বাধিক ১৩টি বিভাগে মনোনয়ন। হলিউডে এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছে ফিসফাস—পুরো অস্কার আসর একাই মাত করে দিতে পারে ‘ওপেনহাইমার’! গুঞ্জন শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয় কি-না, তার জন্য অবশ্য অপেক্ষাই ভরসা।


অস্কারে আল পাচিনোসহ যাঁরা থাকছেন
ছবি অস্কারে মনোনয়ন পাওয়ায় গৃহবন্দি নেতার মুক্তি
এই পৃথিবীতে ফুলেরা যেভাবে নিহত হয়
