‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন পিকার্ড আর ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর এক্স—দুই ভিন্ন চরিত্রে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। মঞ্চ থেকে হলিউড, দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয়জীবনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ৮৬ বছর বয়সে থামল এই কিংবদন্তি অভিনেতার পথচলা।
২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসভবনে মারা যান প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, আলঝেইমার্স রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছেন সহকর্মী ও ভক্তরা। দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং ‘এক্স-মেন’ সহ-অভিনেতা স্যার ইয়ান ম্যাককেলান তাঁকে প্রজন্মের অন্যতম সম্মানিত ও প্রিয় অভিনেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল পর্দার বাইরেও। ২০১৩ সালে প্যাট্রিকের বিয়েতে পৌরোহিত্য করেছিলেন ইয়ান।
‘স্টার ট্রেক’-এর সহ-অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনারও স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, প্যাট্রিক অভিনয়ের প্রতিটি চরিত্রে বুদ্ধিমত্তা, আভিজাত্য ও গভীর মানবিকতা নিয়ে আসতেন। ক্যাপ্টেন পিকার্ড চরিত্রটি মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণাবলির প্রতিনিধিত্ব করত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৪০ সালে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে জন্ম প্যাট্রিকের। অভিনয়ের শুরুটা হয়েছিল থিয়েটার দিয়ে। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিতে। সেখানে কিং জন, ওবেরন ও হেনরি ফোরের মতো চরিত্রে অভিনয় করেন। ধ্রুপদি নাট্যমঞ্চে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরির পর ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে।
তবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি আসে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ দিয়ে। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সিরিজটির ১৭০টিরও বেশি পর্বে ক্যাপ্টেন জঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরে আরও চারটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় এই চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজেও ফিরে এসেছিলেন এই অভিনেতা।
অন্যদিকে ‘এক্স-মেন’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রেও পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ‘লোগান’, ‘ডুন’ ও ‘রবিন হুড: মেন ইন টাইটস’-এর মতো সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন তিনি। মার্ভেল স্টুডিওস তাঁকে এক অনন্য প্রতিভা, উদার সহকর্মী ও প্রকৃত ভদ্রলোক হিসেবে স্মরণ করেছে।
প্যাট্রিকের অভিনয়জীবনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় বিবিসির কমেডি সিরিজ ‘এক্সট্রাস’। ২০০৫ সালে রিকি গারভেইসের সঙ্গে অতিথি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হাসিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর সেই দৃশ্যের একটি ভিডিও শেয়ার করে গারভেইস লিখেছেন, ‘কী অভিনেতা!’ শুটিংয়ের সময় তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও স্মরণ করেছেন এই কৌতুক অভিনেতা।
২০১০ সালে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে নাইট উপাধি পান প্যাট্রিক। অভিনয়ের পাশাপাশি ইয়র্কশায়ারের ফুটবল ক্লাব হাডার্সফিল্ড টাউনের আজীবন সমর্থক ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে ক্লাবটি তাঁকে নিজেদের একজন গর্বিত সদস্য এবং নিজ ক্ষেত্রে দিকপাল হিসেবে স্মরণ করেছে।
মঞ্চ ও পর্দায় অসামান্য অবদানের জন্য রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিও শ্রদ্ধা জানিয়েছে এই অভিনেতাকে। তাঁদের ভাষায়, প্যাট্রিক ছিলেন মঞ্চ ও পর্দা—দুই জগতেরই এক মহীরুহ।
একটি প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন মহাকাশ অভিযানের সাহসী অধিনায়ক, আরেক প্রজন্মের কাছে মিউট্যান্টদের মানবিক অভিভাবক। চরিত্র বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু অভিনয়ের নিজস্বতা দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট থেকে যাবেন তাঁর অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে।


