
গভীর রাত। ঘন জঙ্গল। এই গা ছমছমে পরিবেশে একজন পুরুষ চিৎকার করে নাম ধরে ডাকছে, মূলত খুঁজছে আরেকজনকে। আর তখনই ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। এভাবেই শুরু হয়েছে ‘পর্ণশবরীর শাপ’। শুরুটায় কোনও মেদ নেই, বরং আছে নিখাদ ভয় এবং সিরিজের বাকি সব পর্ব দেখার আমন্ত্রণ। তাতে মজে যেতেই হলো। একে একে দেখা হয়ে গেল ৭টি পর্ব।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে গত ১০ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছে ‘পর্ণশবরীর শাপ’। এর জনরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘পৌরাণিক ভৌতিক’ শব্দ দুটি। এর গল্পের বিষয়ে হইচই লিখেছে, ‘একদল বন্ধুর পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া হঠাৎ করে দেবী পর্ণশবরীর ভয়ঙ্কর অভিশাপে ক্ষতবিক্ষত হতে শুরু করলে, বিখ্যাত তন্ত্র বিশেষজ্ঞ ভাদুড়ি মশাই উপস্থিত হন লৌকিক ও অলৌকিকের মাঝের অবস্থানে পর্যবসিত হয়ে সবাইকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।’
গল্পের সূত্রে কিছু শব্দ পাওয়া যায়। এই যেমন – ভয়ংকর, অভিশাপ, লৌকিক, অলৌকিক, অশুভ শক্তি ইত্যাদি। এসব শব্দগুলো অনুভব করা গেছে ‘পর্ণশবরীর শাপ’ নামের ওয়েব সিরিজটিতে। প্রথম পর্বটি মূলত গল্পের ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে। গায়ে কাঁটা দেওয়া প্রথম দৃশ্যটির পরই ‘ভয়হীন’ দিনে প্রত্যাবর্তন হয়। সেখানেই একদল বন্ধুর দেখা মেলে, যারা পাহাড়ে বেড়াতে এসেছে। এরপর তাদের অভিশাপে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টির অবতারণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম পর্বটি।
এক কথায়, প্রথম পর্বটিই ভৌতিক সিরিজটির প্রতি আকৃষ্ট করে তুলতে যথেষ্ট। এরপর গল্পের বয়ে চলা। সিরিজটির সবচেয়ে ভালো বৈশিষ্ট্য হলো, পরিচালক এক পর্ব থেকে শেষ করে আরেক পর্বে যাওয়ার জন্য দর্শককে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন। ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে এক পর্ব শেষে পরের পর্বে যেতে দর্শকদের আগ্রহী করে তোলা সবচেয়ে কঠিন। সেই আপাত কঠিন কাজটি বেশ সহজেই করেছেন পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। অভিনেতা হিসেবে তাঁর তুলনা মেলা ভার। হয়তো শিগগিরই ওটিটির দুনিয়ায় পরিচালক হিসেবেও তেমনটিই হতে পারে। অন্তত তাঁর এই সাম্প্রতিক সৃষ্টিটি সেই সম্ভাবনাই জাগাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো, শট সিলেকশনে পরমব্রতর কুশলতা। দৃশ্যধারণ, গল্পের প্রবাহ বা ডায়লগ থ্রোয়িং—সবখানেই পরিচালক অতি সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন অতিনাটকীয়তাকে। বরং গল্পের প্রয়োজনেই ধীরে ধীরে দর্শকের চোখের সামনে হাজির হয়েছে রহস্য ও ভয়।
সিরিজে বিখ্যাত তন্ত্র বিশেষজ্ঞ ভাদুড়ি মশাইয়ের চরিত্রে ছিলেন চিরঞ্জীত চক্রবর্তী। বলা হচ্ছে, এই ওয়েব সিরিজ দিয়েই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে পা রেখেছেন বর্ষীয়ান এ অভিনেতা। ভাদুড়ি মশাইয়ের চরিত্রের জন্য একেবারে নিখুঁত বাছাই বলা চলে। তাঁর চোখ ছিল শান্ত, উচ্চারণ তীক্ষ্ণ। রহস্যের কিনারা করতে আসা চরিত্রে রহস্য থাকতেই হয়। সেই বিষয়টি অত্যন্ত পরিমিতভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন চিরঞ্জীত চক্রবর্তী। বলতে দ্বিধা নেই, পুরো সিরিজের মূল আকর্ষণই তাঁর অসাধারণ অভিনয়।
এর বাইরে অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন গৌরব চক্রবর্তী, সুরঙ্গনা বন্দোপাধ্যায়, অনিন্দিতা বসু ও অর্ণ মুখোপাধ্যায়। সবাই যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। স্বস্তির বিষয় হলো, কেউই চরিত্রকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। ফলে তাঁদের অভিনয়ের কারণে খুব একটা বিরক্তি উৎপাদিত হয়নি। বরং উপভোগ করা গেছে।
পাহাড়ে দৃশ্যায়িত বলে ভৌতিক এই সিরিজের ক্যামেরার কাজ দেখতে ভালোই লেগেছে বেশ। পাহাড়, মেঘ এবং ঘন বন–এই তিনটি উপাদানকে কুশলীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে পুরো সিরিজে। আবহসঙ্গীতও ছিল মানানসই।
অবশ্য এত ইতিবাচকতার ভিড়ে কিছু নেতিবাচকও আছে। যেমন: ভৌতিক দুই-একটি দৃশ্যে গ্রাফিক্সের কাজ খুব একটা উচ্চমানের হয়নি। ভূতের মায়ায় আচ্ছন্ন মানুষের মাথা উল্টো ঘুরিয়ে ভয় দেখানো খুবই প্রাচীন কৌশল। এই প্রক্রিয়া ছাড়াও ভয় দেখানোর আরও উপায় নিশ্চয়ই আছে। গ্রাফিক্সের কাজের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, কারণ বাজেটও সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রায় সময়ই। তবে সেক্ষেত্রে বুদ্ধি খাটিয়ে বিকল্প দৃশ্যের পরিকল্পনা দোষের কিছু নয়। অন্যদিকে দেবী পর্ণশবরীর যে মিথের বিষয়টি টেনে রহস্যের জাল বিস্তার করা হয়েছে সিরিজটিতে, সেটি আরেকটু বিস্তৃত করাই যেত। এতে সিরিজের দৈর্ঘ্য হয়তো একটু বাড়ত, তবে মোটের ওপর মন্দ কিছু হতো না তাতে।

সমস্যা কিছুটা আছে ভাদুড়ি মশাইয়ের চরিত্রটি নিয়েও। মূলত সৌভিক চক্রবর্তীর জনপ্রিয় সাহিত্য থেকেই তৈরি হয়েছে ‘পর্ণশবরীর শাপ’। যারা বাংলা সাহিত্যের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে এই নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি হয়ে উঠতে পারেন বিখ্যাত চরিত্র তারানাথ তান্ত্রিকের আধুনিক প্রতিবিম্ব। এই মিল পাওয়াটা খারাপ কিছু নয়। তবে তারানাথকে ছাপিয়ে যাওয়া একটু কঠিনই। সেক্ষেত্রে আলাদা চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠতে হলে আরও কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন হবে ভাদুড়ি মশাইয়ের।
সে যাক গে। মোট কথা হলো, মিস্ট্রি, সাসপেন্স ও হরর – এই তিন উপাদানে প্রায় পূর্ণ ‘পর্ণশবরীর শাপ’। দেখে আর যা-ই হোক, সময় নষ্টের আক্ষেপ হবে না। প্রথম সিজনের শেষ পর্বে ভাদুড়ি মশাইয়ের পরবর্তী মিশন নিয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। তার ওপর আবার দেবীর শাপে বর পেয়ে পুরো ফিট তিনি। সব মিলিয়ে জমজমাট দ্বিতীয় সিজনের প্রত্যাশা তাই করাই যায়।


রিংটোন বাজল কত জোরে?
এফডিসিতে রিয়্যালিটি শোয়ের নামে পিকনিক, জানে না কর্তৃপক্ষ
