কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে ছোটদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। বাবা-দাদার স্বপ্নের পত্রিকাটি নতুন করে শুরু করতে গিয়েই কিংবদন্তি এই নির্মাতার হাতে কলম তুলে নেওয়া। সেই সময়ে তিনি লিখেছিলেন ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ শিরোনামের একটি ছোটগল্প। যেখানে ভিনগ্রহের কোনো আগন্তুকের পৃথিবীতে এসে পড়া মানেই যুদ্ধ করতে আসা, এমনটা যে না-ও হতে পারে সেই বার্তা ছিল গল্পটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এমনকি পরবর্তী সময়ে এই গল্পই হয়ে উঠেছিল ‘দ্য এলিয়েন’ ছবির মূল অনুপ্রেরণা। যদিও ছবির গল্পটি একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু নিজের লেখা ওই ছোটগল্প মাথায় রেখেই যে তিনি ছবিটি তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে তা রীতিমতো স্পষ্ট। শেষপর্যন্ত যদিও ছবিটি আর নির্মিত হয়নি। তবে এই নির্মাণের কথা জানতে পেরে কেঁপে উঠেছিল হলিউডসহ গোটা বিশ্ব। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ ছবির সঙ্গে আশ্চর্য মিল পাওয়া যায় সত্যজিতের এই না-হওয়া ছবির!
১৯৮২ সালের শরৎকাল, বন্ধু ও কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের কাছ থেকে একটি ফোনকল পান সত্যজিৎ। ক্লার্ক তখন স্থায়ীভাবে শ্রীলঙ্কার বাসিন্দা। লন্ডন সফরে গিয়ে স্পিলবার্গের নতুন চলচ্চিত্র ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ দেখে রীতিমতো চমকে যান তিনি। কারণ ষাটের দশকে দ্য এলিয়েন নামে সত্যজিৎ যে ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, বিস্ময়করভাবে সেই চিত্রনাট্যের সঙ্গে স্পিলবার্গের ছবিটির অনেক কিছুই মিল রয়েছে! আজ (২ মে) কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকী। বিশেষ দিনে অন্যান্য স্মৃতির পাশাপাশি বরাবরই আলোচনায় উঠে এসেছে এই ঘটনা।
ঠিক কী হয়েছিল? শুরু করা যাক প্রথম থেকেই! ১৯৬৬ সাল। সত্যজিৎ সেই সময় লন্ডনে। সেখানেই আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে দেখা। ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’ ছবির কারণে কিংবদন্তি এই কল্পবিজ্ঞান লেখক তখন সেখানে। বিখ্যাত দুই মানুষের আড্ডা জমে উঠল। সত্যজিৎ তখন বন্ধু ক্লার্ককে শেয়ার করেন যে তাঁর মাথায় একটি কল্পবিজ্ঞান ছবির আইডিয়া রয়েছে। গল্পের আইডিয়া শুনে বেশ উচ্ছ্বসিত ক্লার্ক! তিনি খুবই উৎসাহ দিলেন।

শুধু উৎসাহ দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হলেন না! তাঁরই নির্দেশে কয়েকদিনের মধ্যে ভারতে এসে সত্যজিতের সঙ্গে দেখা করলেন মাইক উইলসন। তিনি ক্লার্কের এজেন্ট। তাঁর তাগিদেই শত ব্যস্ততার মাঝেও সত্যজিৎ দ্রুত শেষ করে ফেলেন সেই ছবির চিত্রনাট্য। সবকিছুই এগোতে থাকে খুব দ্রুত। ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হন বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা পিটার সেলার্স। ঐতিহ্যবাহী কলম্বিয়া পিকচার্সও রাজি হয়ে যায় ছবিটি প্রযোজনা করতে। সত্যি বলতে, ততদিনে গোটা বিশ্বের কাছে সত্যজিৎ এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে গেছেন। তাঁর ছবিতে কাজ করতে উন্মুখ বিশ্বের তাবড় তাবড় তারকা। বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান হাস্কেল ওয়েক্সলার জানিয়েছিলেন, তিনি সত্যজিতের ছবিতে কাজ করবেন। কেবল একটাই শর্ত! কোনো পারিশ্রমিক তিনি গ্রহণ করবেন না। ছবিটি করতে প্রবল উৎসাহী ছিলেন মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো হলিউড তারকাও। একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় তাঁর অভিনয়ের কথাও মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৭ সালে কলম্বিয়ার সঙ্গে সত্যজিতের চুক্তি হয় ১০ হাজার ডলারের। সেই সময় এই অঙ্ক অভাবনীয়! অথচ তৈরিই হলো না সেই ছবি। এ এক বিরাট ট্র্যাজেডি! যে ছবি হতে পারত সত্যজিতের শিল্পকর্মের এক বিশেষ অলঙ্কার, তা আর আলোর মুখই দেখল না!
সত্যজিতের দ্য এলিয়েন না হওয়ার পেছনে অন্যতম দায়ী ব্যক্তির নাম মাইক উইলসন। চিত্রনাট্য জমা দেওয়ার সময় তিনি লিখে দিয়েছিলেন কপিরাইট সত্যজিতের সঙ্গে তাঁরও! আর তাতেই গোল বাঁধে। চুক্তির ওই প্যাঁচ ধরতে পারেননি সত্যজিৎ। ক্রমশ বিষয়টি আরও জটিল হতে থাকে। এদিকে, অভিনেতা পিটার সেলার্সও হঠাৎ বেঁকে বসে জানালেন এই চরিত্রে তাঁকে মানাচ্ছে না। ফলে তাঁর বিকল্প অভিনেতা খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তার চেয়ে বড় সমস্যা বাঁধিয়েছেন মাইক। কলম্বিয়া পিকচার্সের পক্ষ থেকে তখন সত্যজিৎকে বলা হয় মাইককে পুরো বিষয়টি থেকেই সরিয়ে দিতে। কারণ মাইক নিজের নামটি রেখেছিলেন প্রযোজক হিসেবে। কিন্তু কলম্বিয়া পিকচার্স জানায় যে উইলসন নয়, তারাই ছবিটি প্রযোজনা করবে। তবে অনেক চেষ্টার পরেও মাইককে সরানো যায়নি। একসময় হাল ছেড়ে দেন সত্যজিৎ। ১০ হাজার ডলারের কানাকড়িও তাঁর হাতে আসেনি।

সময় বয়ে যায়! অনেক পরে স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টার্স অব দ্য থার্ড কাইন্ড’ (১৯৭৭) ও ‘ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ (১৯৮২) ছবি দুটি দেখে সত্যজিৎ চমকে ওঠেন। ধরতে পারেন তাঁর আইডিয়া ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে গল্পগুলোর! ১৯৮৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে ইটি সম্পর্কে সত্যজিৎ স্পষ্টভাবেই বলেন, ‘‘আমার লেখা ‘দ্য এলিয়েন’র চিত্রনাট্য ছাড়া এই ছবিই তৈরি করতে পারতেন না স্পিলবার্গ।” একই মত ছিল আর্থার সি ক্লার্কেরও। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসেও এ ঘটনা নিয়ে লেখালেখি হয়।
সত্যজিতের ধারণা ছিল তাঁর ছবির সেই চিত্রনাট্যের অসংখ্য কপিই নাকি হলিউডে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে তা নির্মাণের আগেই ‘ফাঁস’ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদিও এসব অভিযোগ উড়িয়ে দেন স্পিলবার্গ। তিনি জানিয়েছেন, যে সময় সত্যজিৎ হলিউডে, সেই সময় তিনি নাকি নেহাতই স্কুলপড়ুয়া! তবে তাঁর এই দাবি সত্যি নয়। কারণ ততদিনে তিনি হলিউডে পা রেখে ইন্টার্নশিপ শুরু করেছেন।
অবশ্য পরেও ছবিটি করতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ। কিন্তু বারবার আলাপ-আলোচনার পরও শেষপর্যন্ত তা পৃথিবীর আলো দেখেনি। এক রেডিও সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎকে বলতে শোনা গিয়েছিল, তিনি এখন ওই ছবি করলেই বলা হবে—‘স্পিলবার্গের থেকেই আইডিয়া তিনি ধার করেছেন!’ অথচ বিষয়টি একেবারেই উল্টো! অবশেষে তৈরি হয়নি দ্য এলিয়েন, শুধু চিত্রনাট্য রয়ে গেছে। সত্যজিত যদি ছবিটি নির্মাণ করতেন, তবে ভারতীয় কল্পবিজ্ঞান ছবির দুনিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতো—তা ভেবে আজও রোমাঞ্চিত হয় সিনেপ্রেমীদের মন।
সূত্র: দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, সংবাদ প্রতিদিন


যে গানের পেছনে এক দশকের গল্প
