ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এর বাহক হচ্ছে এডিস মশা। একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী থেকে অন্য সুস্থ মানুষের শরীরে মশার কামড়ে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
বাংলাদেশে মূলত ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। তখন থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর উপসর্গ এবং লক্ষণ প্রায় অভিন্ন ছিল। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার চরিত্রও কম-বেশি একই রকম ছিল। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকেই সব কিছুতেই ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালীন রোগ নয়, সারা বছর ধরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এখন এডিস মশা পরিষ্কার ও নোংরা পানি--সব জায়গাতেই ডিম পাড়তে পারে এবং দিনে-রাতে যে কোন সময়ই মানুষ কে কামড়াতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ ও লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুই ধরনের - ক্ল্যাসিক্যাল বা সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর এবং হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরা ডেঙ্গু। ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ হচ্ছে - তীব্র জ্বর (১০৪/১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং প্রচন্ড মাথা ব্যাথা, শরীর বা হাড়ের জোড়ায় অসহনীয় ব্যাথা। এ ছাড়া বমিবমি ভাব, খাবারে অরুচি, শরীরে লাল ফুসকুড়ি (Rash) ইত্যাদি লক্ষণ থাকতে পারে। রক্তক্ষরা ডেঙ্গুতে বমি, কফ, মল-মুত্রের সঙ্গে অথবা দাঁতের গোড়া, নাকের ছিদ্র বা চোখে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগী জ্ঞান হারানোর অবস্থা এবং পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। রক্তক্ষরা ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গু-শক এ আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু-ঝুঁকি অনেক বেশি।
এ বছর ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ সমুহের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকের অল্পমাত্রার জ্বর থাকে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর নাও থাকতে পারে। অনেকের পাতলা পায়খানা, বমি, পেটব্যাথা, ক্ষুধামন্দা, মাথাঘোরা, দুর্বলতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এদের কেউ কেউ অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসন্নতার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে যে তারা ডেঙ্গু আক্রান্ত।
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু –জটিলতা
গর্ভাবস্থায় নারী স্বভাবতই সংবেদনশীল থাকেন। তাঁর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কিছুটা কমে যায়। এ সময়ে ডেঙ্গু হলে গর্ভবতী মা ও তার গর্ভস্থ শিশুর নানা ধরণের জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রথম তিন মাসে অধিকাংশ গর্ভবতী নারী স্বাভাবিকভাবেই হরমোনজনিত কারণে বমিবমি ভাব বা বমি হওয়া, খাবারে অরুচি, শরীরের তাপমাত্রা কিঞ্চিৎ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গে ভোগেন। এ ছাড়া গর্ভকালীন যে কোন সময়ে নারীর মূত্রথলির সংক্রমনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এজন্য তাঁর অল্প জ্বর থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাল্টে যাওয়া ডেঙ্গুর ধরণেরর সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরী হতে পারে। ফলে অনেক গর্ভবতী নারী বেশ দেরীতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসেন।
গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে অণুচক্রিকা বা প্ল্যাটিলেট স্বাভাবিকভাবে কিছুটা কম থাকতে পারে। কোন নারী প্রি-এক্লামসিয়ার মতো গর্ভজনিত জটিলতার শিকার হলে তাঁর রক্তের প্ল্যাটিলেট বা অণুচক্রিকা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। আরো কিছু জটিলতা যেমন ‘হেল্প সিনড্রোম’ হলে গর্ভবতী নারীর যকৃতের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ এবং পেটে বা ফুসফুসে পানি জমতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু রোগীর মাথা ব্যাথা, পেটে ব্যাথা, বমিবমি ভাব ইত্যাদি লক্ষণ থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষের তিন মাসে অথবা প্রসবের পর পরই এই সমস্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই সব উপসর্গের সঙ্গে ডেঙ্গুর জটিলতার অনেক মিল থাকায় বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়।
গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, এমনকি প্রসবকালীন বা প্রসব পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন গর্ভকালীন বা প্রসবকালীন জটিলতার কারণে প্রসবপথে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। আবার হেমোরেজিক ডেঙ্গুজনিত কারণেও এমনটি হতে পারে।
দ্বিতীয় বা তৃতীয় 'তিনমাসে' গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু আক্রান্তের ফলে গর্ভস্থ শিশুর নানা ধরনের জটিলতা হতে পারে। এরমধ্যে অকাল প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম নেয়া, মৃত সন্তান প্রসব ইত্যাদি অন্যতম। ডেঙ্গু আক্রান্ত মা যদি আক্রান্ত হওয়ার ২ সপ্তাহের মধ্যে সন্তান প্রসব করেন, সেক্ষেত্রে নবজাতকের শরীরে ডেঙ্গু সংক্রমণ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
বিভ্রান্তি এবং জটিলতা প্রতিরোধে করণীয়:
১. প্রথমত সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা একান্ত জরুরী। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণের কোন বিকল্প নেই।
২. গর্ভজনিত উপসর্গ/জটিলতা অথবা গর্ভকালীন সময়ে ডেঙ্গু জ্বর বা ডেঙ্গুজনিত জটিলতা সম্পর্কে বুঝতে হলে গর্ভাবস্থায় প্রতিটি নারীকে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা নিয়মিত চেক- আপ করাতে হবে। এই সকল দক্ষ কর্মীই তখন প্রয়োজনে তাদেরকে রেফারেল হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠাবেন। এতে তাঁর রোগ নির্ণয় করা সহজতর হবে।
৩. একজন গর্ভবতী নারীকে গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও তরল খাবার খেতে হয়। প্রয়োজন হলে প্রথম তিন মাসে বমির ওষুধ খেতে হতে পারেন। এরপরেও বমি না কমলে এবং মুখে খেতে না পারলে (যাকে বলে হাইপার ইমেসিস গ্র্যাভিডারাম) রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া হয়। অর্থাৎ কোনভাবেই যেন শরীরে পানি শূন্যতা তৈরি না হয়। এর পাশাপাশি দরকার পরিমিত বিশ্রাম। এই সময়ে যদি কারও রূপ-বদলানো ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু হয় এবং তিনি যদি এমনিতেই উপরোক্ত নিয়মাবলি মেনে চলেন, তাহলে কিন্তু তার ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
৪. গর্ভকালীন সময়ে জননপথে রক্ত যাওয়া একটি অস্বাভাবিক অবস্থা। এক্ষেত্রে মা কে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। প্রি-একলামসিয়া বা হেল্প সিনড্রোম ইত্যাদি গর্ভজনিত জটিলতার প্রাথমিক উপসর্গ হলো মাথা ব্যাথা, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি। অনেক লক্ষণই ডেঙ্গু শক বা হেমোরেজিক ডেঙ্গুর সাথে মিলে যায়। গর্ভবতী নারী যদি নিয়মমাফিক চেক-আপে থাকেন, তাহলে তার অনেক জটিল সমস্যাই সমাধান সম্ভব।
ডেঙ্গু হলে করনীয়:
১. ডেঙ্গু জ্বর হলে যে কোন রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার যেমন পানি, লেবুর শরবত, ওরস্যালাইন, স্যুপ, তাজা ফলের রস ইত্যাদি খেতে হবে। অর্থাৎ শরীরে যেন পানিশূন্যতা তৈরি না হয়।
২. সহজপাচ্য ও শক্তিদায়ক খাবার - নরম ভাত, খিচুড়ি, আমিষ জাতীয় খাবার (মাছ, ডিম, ডাল) ইত্যাদি খাওয়াতে হবে।
৩. প্রচুর পরিমানে টাটকা শাক-সবজি, মৌসুমি ফল খেতে হবে, যেমন পাকা কলা, পেপে, পেয়ারা, ডালিম, তরমুজ, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি। এসবে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ উপাদান - যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। জ্বর থাকাকালীন সময়ে (সাধারণত জ্বর থাকে এক থেকে চার দিন) বিশ্রামে থাকতে হবে। জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরের তিন দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারন তখন শরীরের রক্তবাহিত শিরা থেকে জলীয় অংশ বের হওয়ার আশংকা থাকে। ফলে এই সময়ে শরীরের নাড়ীর গতি বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, পেট বা ফুসফুসে পানি জমা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরেও তিন-চার দিন বিশ্রামে থাকা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ:
১. ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাই কে একসঙ্গে মশা নিধনের কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
২. ডেঙ্গু রোগের বিষয়ে সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। গর্ভবতী মায়ের শরীরে যে কোন সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক সময় ডেঙ্গু পরীক্ষা নেগেটিভ হলেও চিকিৎসকগণ উপসর্গের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
৩. একজন গর্ভবতী নারী মূলত দুটি জীবনের জিম্মাদার। একটি নিজের এবং অন্যটি গর্ভস্থ শিশুর। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত গর্ভধারীণীর চিকিৎসায় দ্বিগুণ গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিদ্যা), কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ



