বিশ্বজুড়ে অক্টোবর মাস ‘পিঙ্ক মান্থ’ বা স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এই উপলক্ষে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গতকাল (২২ অক্টোবর) যশোর জেলার শার্শা উপজেলায় আয়োজন করা হয় একটি সেমিনার ও আলোচনা সভার।
শার্শা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত স্তন ক্যান্সার সচেতনতা বিষয়ক এই সেমিনার ও আলোচনা সভাটির আয়োজনে যৌথভাবে ছিল যশোর জেলার শার্শা উপজেলা প্রশাসন, শার্শা উপজেলা কলেজ, শার্শা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং ‘আমরা নারী’ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ক্যান্সার সার্জন ও বিশেষজ্ঞ ডা. বনি আমিন।
বিশেষ আলোচক হিসেবে ছিলেন শার্শা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিয়াজ মাখদুম। তিনি বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিজের প্রতি যত্নশীল থাকা। প্রতিটি নারী যদি নিজের শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে উপকৃত হবেন শুধু তিনি নন, তার পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মও। সময়মতো রোগ সনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ এবং ইতিবাচক মনোভাব—এই তিনটি বিষয়ই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী হাতিয়ার।’
এ প্রসঙ্গে শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। ক্যান্সারমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য এখনই শিক্ষাঙ্গন থেকে সামাজিক আন্দোলনের সূচনা জরুরি।’
‘আমরা নারী’-এর নির্বাহী সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নারী শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি মানবিক অনুপ্রেরণা। আমরা প্রত্যেকে যদি সচেতনতার দূত হয়ে এগিয়ে আসি, তাহলে ক্যান্সারমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।’
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী এম. এম. জাহিদুর রহমান (বিপ্লব) বলেন, ‘আমরা নারী একটি অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সামাজিক সংগঠন, যা দীর্ঘদিন ধরে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নারীর অধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্তন ক্যান্সার সচেতনতার দূত বা ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে গড়ে তোলা— যাতে তারা সমাজে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।’
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩,০০০ নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সময়মতো সনাক্ত না হওয়ার কারণে প্রাণ হারান। দেশের মোট ক্যান্সার রোগীর প্রায় এক-ষষ্ঠাংশই স্তন ক্যান্সারে ভোগেন। অথচ নিয়মিত আত্মপরীক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
স্তন ক্যান্সার সম্পর্কিত ঝুঁকি, সতর্কতা, পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ক্যান্সার সার্জন ও বিশেষজ্ঞ ডা. বনি আমিন। তাঁর বক্তব্যের সারাংশ এখানে তুলে ধরা হলো:
ডা. বনি আমিন বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার নারীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার (জন্য) অন্যতম বড় হুমকি। এটি তখন সৃষ্টি হয়, যখন স্তনের কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং টিউমারে পরিণত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতা বজায় রাখলে সহজেই (এটি) শনাক্ত করা সম্ভব।’
স্তন ক্যান্সারের দুটি ধাপ:
প্রাথমিক বা সীমাবদ্ধ ধাপ: এই পর্যায়ে ক্যান্সার কোষ স্তনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে প্রায় শতভাগ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী বা বিস্তৃত ধাপ: এই পর্যায়ে ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়।
ঝুঁকির কারণসমূহ:
বয়স, বংশগত ইতিহাস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, মানসিক চাপ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সতর্কতার লক্ষণ:
স্তনে গুটি, ত্বকে কুঁচকানো, বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক স্রাব, বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া বা আকার পরিবর্তন— এসবই হতে পারে প্রাথমিক সতর্কতা সংকেত। এসব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা:
স্তন ক্যান্সার শনাক্তে ম্যামোগ্রাম, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও বায়োপসি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতা প্রায় শতভাগ। বর্তমানে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে কার্যকরভাবে নিরাময় সম্ভব।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা:
সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা ও নিজের প্রতি যত্নশীলতা— এই তিনটি বিষয়ই স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের মূলমন্ত্র। প্রতিটি নারী যদি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে কেবল নিজেই নয়, তার পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মও উপকৃত হবে।
স্তন ক্যান্সার বিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপরও সভায় জোর দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও অনুষ্ঠিত হয়েছে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা বিষয়ক সেমিনার ও আলোচনা সভার, যার আয়োজনেও ছিল ‘আমরা নারী’ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’।


স্তন ক্যান্সার বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে
পাঁচ লক্ষণ চিনিয়ে দেবে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি
