ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৪২ বছর বয়সী রেজওয়ান পারভেজ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তিনি গিয়েছিলেন মাত্র কয়েক মাস আগে। রিপোর্টে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। ইসিজি ঠিক, কোলেস্টেরলও নিয়ন্ত্রণে। চিকিৎসকের ভাষায়, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ একদিন অফিসে কাজ করার সময় বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ধরা পড়ে হার্ট অ্যাটাক।
এমন ঘটনা এখন শুধু একজনের গল্প নয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি সব রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে, তাহলে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে কেন?
ইসিজি কি সব ঝুঁকি ধরতে পারে?
হৃদ্যন্ত্রের প্রাথমিক পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম বা ইসিজি। বহু মানুষ মনে করেন, ইসিজি স্বাভাবিক মানেই হৃদ্যন্ত্র সুস্থ। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।
ইসিজি মূলত হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম রেকর্ড করে। এটি তখনই পরিবর্তন দেখায়, যখন হার্টে ইতিমধ্যেই বড় ধরনের সমস্যা ঘটে গেছে বা রক্তপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ধমনিতে ধীরে ধীরে জমতে থাকা চর্বি বা ব্লকেজ অনেক সময় ইসিজিতে ধরা পড়ে না।
অর্থাৎ একজন মানুষ বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখালেও তার শরীরে ভিতরে ভিতরে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কোলেস্টেরল রিপোর্টও কি যথেষ্ট?
অনেকে আবার রক্তে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলে নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু গবেষণা বলছে, কেবল কোলেস্টেরল দেখে হৃদ্রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
কারণ অনেক সময় কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলেও শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (ইনফ্ল্যামেশন) থাকে, যা হার্ট অ্যাটাকের বড় কারণ হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসায় এখন কিছু অতিরিক্ত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে। যেমন- এইচএস সিআরপি, এপো-বি ও লাইপোপ্রোটিন (এ)। কিন্তু সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এই পরীক্ষাগুলো থাকে না।
মানসিক চাপও নীরব শত্রু
শহুরে জীবনে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ। অফিসের কাজ, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অনিয়মিত ঘুম সব মিলিয়ে শরীরে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়।
চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে এমন হরমোন তৈরি করে যা রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন এবং রক্তের শর্করা বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো হঠাৎ চাপ বেড়ে গেলে ধমনিতে থাকা জমাট চর্বি ছিঁড়ে গিয়ে রক্তনালী বন্ধ করে দিতে পারে। যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চাপ বা বিষণ্নতায় থাকা মানুষের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেশি।
কোন পরীক্ষাগুলো বেশি কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ইসিজি বা সাধারণ রক্ত পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকি বুঝতে আরও কিছু পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে স্ট্রেস টেস্ট, করোনারি ক্যালসিয়াম স্ক্যান ও এইচএস সিআরপি। এই পরীক্ষাগুলো অনেক সময় আগে থেকেই ঝুঁকি ধরতে সাহায্য করে।
কেন বাড়ছে এই সমস্যা?
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে হার্ট অ্যাটাক এখন আগের চেয়ে অনেক কম বয়সে হচ্ছে। অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ব্যায়ামের অভাব এবং ঘুমের সমস্যা। সব মিলিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি ‘স্বাভাবিক রিপোর্ট’ দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ হৃদ্রোগ অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়, ধীরে ধীরে।
স্বাভাবিক ইসিজি বা রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট মানেই যে হার্ট সম্পূর্ণ সুস্থ, এটা এখন আর নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এটি কেবল একটি অংশমাত্র। চিকিৎসকেরা বলছেন, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বুঝতে হলে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ।
তথ্যসূত্র: টাইমস নাও নিউজ


গরমে তরমুজ কেন খাবেন? জেনে নিন
মাত্র ২০ মিনিট প্রকৃতিতে থাকলেই কমে চাপ, বাড়ে সুস্থতা
অতিপ্রসেসড খাবার কি নীরবে বদলে দিচ্ছে শরীরের মাংসপেশি? নতুন গবেষণায় উদ্বেগের ইঙ্গিত
