অনেকে মনে করেন, সানস্ক্রিন শুধু গরমের সঙ্গী। এই সময়টাতে তীব্র রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকে বলেই এটি ব্যবহার করা হয়। শীতে যেহেতু সূর্যের তাপ থাকে কম, তাই সানস্ক্রিনের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। আসলে বিষয়টি পুরোপুরি ভুল। কারণ রোদের তীব্রতা কম বা বেশি হলেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি কিন্তু একই থাকে। তাই শীতকালেও ত্বককে সুরক্ষিত রাখে সানস্ক্রিন।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও ত্বকসেবা বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা আব্দুল্লাহ্ প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘সূর্যের ইউভি রশ্মি ত্বকে প্রদাহ, কালচে দাগ, মেছতা, সূর্যদাগ, আগেভাগে বয়সের ছাপ পড়া, ত্বক কুঁচকে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই গরম-শীত নয়, সানস্ক্রিন আসলে একটা বারোমাসি সুরক্ষা। ছেলে-মেয়ে সবারই শীতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত।’
অনেকেই ভাবেন, ঘরে থাকলে বা অফিসের ভেতরে থাকলে সানস্ক্রিন লাগানোর দরকার নেই। কিন্তু ল্যাপটপ বা বড় স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলোও ত্বকের ক্ষতি করে। তেমনই গাড়ির কাঁচ কিংবা বাড়ির জানালাও ইউভি-এ রশ্মি পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। ফলে ঘরে বা অফিসে বসেও আমরা অজান্তে ত্বককে ক্ষতে ফেলছি। তাই বাইরে যাওয়া না হলেও সকালে স্কিনকেয়ারের শেষে সানস্ক্রিন লাগানো ভালো।
কোন ত্বকে কেমন সানস্ক্রিন
কে কোন সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন, এ নিয়েও অনেকের দ্বিধা থাকে। আমাদের ত্বকের ধরন সাধারণত চার রকম হয়ে থাকে। স্বাভাবিক, তৈলাক্ত, শুষ্ক ও সংবেদনশীল। যাদের ত্বক তৈলাক্ত বা ঘাম বেশি হয়, তাদের জন্য ম্যাটিফাইং বা জেল বেসড সানস্ক্রিনই উপযুক্ত। এতে মুখে ভারী ভাব আসে না এবং ঘামেও সহজে উঠে যায় না।
আবার যারা বেশি ঘামেন বা আউটডোরে কাজ করেন, যেমন খেলোয়াড় বা মাঠকর্মী। তাদের ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিন দরকার। সুইমিংপুলে বা সমুদ্রের ধারে গেলে ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিনই বেশি কার্যকর, কারণ পানির সংস্পর্শে সাধারণ সানস্ক্রিন দ্রুত উঠে যায়।
অন্যদিকে যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের জন্য অয়েল-বেসড সানস্ক্রিন বেশ আরামদায়ক। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে খনিজ-ভিত্তিক সানস্ক্রিন নিরাপদ। এর উপাদান যেমন জিঙ্ক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড ত্বকে কোনো জ্বালাপোড়া ছাড়াই সূর্যরশ্মি প্রতিহত করে।
সানস্ক্রিন কেনার সময় যা খেয়াল রাখবেন
সানস্ক্রিন কেনার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এসপিএফ বা সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর। এসপিএফের ওপর নির্ভর করে সানস্ক্রিন ত্বককে কতক্ষণ রক্ষা করতে পারবে। বাংলাদেশে সাধারণত এসপিএফ ৩০ বা ৫০ পাওয়া যায়। শীতকালেও এসপিএফ ৩০ বা ৫০ ব্যবহার করতে হবে।
এসপিএফ ৫০ প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং এসপিএফ ৩০ প্রায় ৯৭ শতাংশ অতিবেগুনি রশ্মি ব্লক করতে পারে। যাদের ত্বক খুব সংবেদনশীল, যাদের মেছতা বা রোদে পোড়ার প্রবণতা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে এসপিএফ ৫০ ব্যবহার করবেন। তবে যাদের ত্বকে এমন কোনো সমস্যা নেই, তাদের জন্য এসপিএফ ৩০-এর মতো মাঝারি স্তরের সানস্ক্রিনই যথেষ্ট।
সানস্ক্রিন লাগানোর নিয়ম জানেন তো?
নতুন কোনো সানস্ক্রিন ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করা উচিত। অর্থাৎ হাতে বা গলায় সামান্য লাগিয়ে দেখে নেওয়া যে কোনো অ্যালার্জি হচ্ছে কি না। আবার সানস্ক্রিন লাগানোর পরই মুখে ভারী ক্রিম বা অন্য কিছু লাগালে ত্বকে রিঅ্যাকশন হতে পারে। তাই সানস্ক্রিনটিকে ত্বকে ভালোভাবে সেট হতে কয়েক মিনিট সময় দিতে হবে। চোখের খুব কাছাকাছি সানস্ক্রিন লাগালে তা জ্বালাপোড়া করতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই কমে যায়। ফলে দিনের বেলা বাইরে থাকলে বা রোদে ঘুরলে সানস্ক্রিন পুনরায় লাগাতে হবে। বিশেষ করে যারা বেশি ঘামেন, তাদের আরও দ্রুত সানস্ক্রিন নষ্ট হয়ে যায়। তাই কাছে স্প্রে সানক্রিন রাখতে পারেন। যাতে সহজেই সানস্ক্রিন লাগাতে পারেন।
সবশেষে ডা. ফারজানার মতে, ‘ত্বককে সুন্দর ও সুস্থ রাখতে দামি পণ্য দরকার হয় না, দরকার নিয়মিততা। সানস্ক্রিন এমন এক পণ্য, যা আপনার ত্বকের বয়স কমিয়ে দেয়। তাছাড়া দাগ-ছোপ কমিয়ে কমায়ে, ত্বককে দীর্ঘদিনের জন্য মসৃণ রাখে।’
শীতের কোমল রোদ যতই আরামদায়ক হোক, ত্বকের প্রতি তা কখনো কোমল নয়। বরং ঠিকমতো যত্ন না নিলে সেই রোদই ত্বকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই শীতের সকালেও সানস্ক্রিন লাগিয়ে নেওয়া প্রতিদিনের স্কিনকেয়ারের একটি অপরিহার্য ধাপ, এমনটাই বলছেন গবেষণা, ডার্মাটোলজিস্ট এবং বিশেষজ্ঞরা।


শীত এলে নয়, আগেভাগেই শুরু করুন ত্বকের যত্ন
দিনে অন্তত দু’বার ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুতে হবে, কিন্তু কেন?
