নিউইয়র্ক, লন্ডন, মিলান, প্যারিস থেকে শুরু করে এশিয়ার টোকিও, সিউল- শহরগুলোতে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ সপ্তাহের চেয়ে ‘ফ্যাশন সপ্তাহ’ যেন বেশি দেখা গেছে। র্যাম্পে মডেলরা ক্যাটওয়াকের মাধ্যমে হরহামেশাই আগুন ঝরান।
কিন্তু সম্প্রতি ‘অট কোচার’ বা ফ্যাশন টিভির পর্দায়ও সর্বাধিকবার দেখা এবং আলোচিত অনুষ্ঠানগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ঝলমলে গাউন আর চোখ-ধাঁধানো অ্যাকসেসরিজে ঠাসা ফ্যাশনের ঠাঁই হয়েছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতেও।
ফ্যাশন দুনিয়ায় পরিচিত নাম কার্ল লেজারফেল্ড। শ্যানেলের এই প্রয়াত ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘বিকামিং কার্ল লেজারফেল্ড’- এর জনপ্রিয়তা দেখে ডিজনি প্লাস আরেক ইউরোপীয় ফ্যাশন হাউস ব্যালেনশিয়াগার কর্ণধার ক্রিস্টোবাল ব্যালেনসশিয়াগাকে নিয়েও শো নির্মাণ করেছে।
ফেব্রুয়ারিতে অ্যাপল টিভি প্লাসে ‘দ্য নিউ লুক’ নামে আরেকটি শো রিলিজ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোকো শ্যানেল এবং ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের বিপরীতমুখী অবস্থান তুলে ধরা হয় সেখানে। শ্যানেল নাৎসিদের সাথে হাত মেলান, অন্যদিকে এই নাৎসিদেরই বন্দিশিবিরে ক্রিশ্চিয়ান তাঁর বোনকে প্রায় হারাতে বসেছিলেন!
ওটিটির প্রসঙ্গ যখন এলো, অবধারিতভাবে নেটফ্লিক্সের নামও নিতে হয়। তুমুল জনপ্রিয় এই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি সম্প্রতি ‘স্পাইস গার্ল’ ভিক্টোরিয়া বেকহামকে নিয়ে ডকুসিরিজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। এর বাইরেও জ্যারেড লেটো অভিনীত কার্ল লেজারফেল্ডের আরেকটি বায়োপিক এবং গুচির প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে সিরিজ আসতে চলেছে।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, টিভি আর সিনেমার প্রযোজকেরা ফ্যাশনের মধ্যে বিনিয়োগ করছেন কোন তাড়নায়?‘হাই ফ্যাশন’ মানেই ‘হাই ড্রামা’-হতে পারে এটি একটি কারণ। আসলে দারুণ সৃজনশীল, গ্ল্যামারাস আর মেধাবী মানুষের সন্নিবেশে এই শিল্পটি গড়ে উঠেছে। আবার এই মানুষগুলোই জেদি, নিয়ন্ত্রক আর অত্যাচারী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে থাকেন। ডিজাইনারদের পরস্পরের মধ্যেও কাজ করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা; লেজারফেল্ডের সঙ্গে ইয়েভেস সেন্ট লরেন্টের, ব্যালেনশিয়াগার সঙ্গে ডিওরের, আবার ডিওরের সঙ্গে শ্যানেলের বেলায় যা স্পষ্ট ছিল।
বলতে গেলে একজন লেখকের জীবনের চেয়ে ফ্যাশনিস্তাদের জীবন অনেক বেশি রঙেরসে পূর্ণ। এজন্যই প্রযোজকদের আগ্রহের মাত্রাও এদিকে ঝোঁকা।
আরেকটি কারণ হলো, হলিউডের ব্র্যান্ডপ্রীতি। বার্বি থেকে ফেরারি- স্টুডিওগুলো লোকপ্রিয় পণ্য ঘিরেই সিনেমার গল্প বুনছে এখন। এই দিকে এখাতে পয়সা বিনিয়োগ করাটাও নিরাপদ; দর্শকেরা যে বুটিক বা প্রসাধন কোম্পানির নাম ইতিমধ্যে জানে, তা নিয়ে শিল্প নির্মাণ হলে তাদের যে দেখার আগ্রহ থাকবে সে তো সহজেই অনুমেয়।
ফ্যাশন হাউসগুলো নিজেদের উদ্যোগেও এখন স্টোরিটেলিংয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা মূলত নিজেদের ভাবমূর্তির নিয়ন্ত্রণ করছে। টেলিভিশন কস্টিউম নিয়ে লেখা বই ‘স্ক্রিন স্টাইলে’র লেখক মার্নি ফগ এমনটিই মনে করেন। ‘দ্য নিউ লুক’ এর শেষ দৃশ্যে নেপথ্য সংগীতের সঙ্গে ডিওরের আউটফিটের যে মন্তাজ তুলে ধরা হয়েছে, তা নাটকের পরিসমাপ্তির চেয়েও বিজ্ঞাপন হিসেবেই বেশি ধরা দেয়। এমনকি এই শোয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ডিওর নতুন একটি সুগন্ধিও বাজারে ছেড়েছে; অর্থাৎ ব্যবসার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা যাবে না!
এর বাইরেও কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রচারকৌশল সম্পর্কে জানলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য! নতুন কালেকশনের সাথে ক্রেতাদের পরিচয় করাতে বালমেইন ২০২১ সালে ‘ফ্রাকচার’ নামে একটি মিনি-সিরিজ মুক্তি দেয়। অন্যদিকে শ্যানেল যুক্ত ছিল ‘টোয়াইলাইট’ তারকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টের ছবি প্রযোজনায়। ক্রিস্টেন তাদের পণ্যদূতের একজন। ‘স্পেনসার’ -এ প্রিন্সেস ডায়ানার ভূমিকায় অভিনয়ের সময় ক্রিস্টেনের গায়ে স্বাভাবিকভাবেই শ্যানেলের পোশাক বেশি দেখা গেছে। ছবিটি মুক্তির সময় শ্যানেলের ব্লেজার এবং ব্যাগের খোঁজও বেড়ে গিয়েছিল। এ কথা তাই নিশ্চিত করে বলাই যায় যে, প্রচার সার্থক হয়েছে।
ফরাসী ফ্যাশন হাউস সেন্ট লরেন্ট গত বছর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খোলার পাশাপাশি তিনটি ফিচার সিনেমায়ও প্রযোজকের ভূমিকা পালন করেছে। তাদের এসব ছবি সরাসরি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়!
ইউরোপের সবচেয়ে বিত্তশালী কোম্পানির অন্যতম এলভিএমএইচও এবার তাদের নিজস্ব মিডিয়া আউটলেটের উদ্বোধন করেছে। এখান থেকে সিনেমা, টিভি শো আর পডকাস্ট নির্মিত হবে। লাক্সারি গ্রুপটির মালিকানায় রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ১৪টি ফ্যাশন ব্র্যান্ড। সেলিন, ডিওর, ফেন্ডি, গিভেনশি, লুই ভিতোর মতো বাঘা বাঘা ফ্যাশন হাউস যেখানে এক ছাদের নিচে, সেখানে গল্পকারদের রসদের কখনো অভাব হবে!
ফ্যাশন থেকে এবার বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিতে ১১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো রাজস্ব যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে যা ছিল মাত্র ৮৬ বিলিয়ন ডলার! তবে ক্রেতা টানার পুরনো কোনো কৌশল এখন আর ধোপে টিকবে না বলে সতর্ক করছেন ফ্যাশনবোদ্ধারা।
সানশাইন নামের একটি বিজ্ঞাপনী পরামর্শক সংস্থার কর্মী জেনা বার্নেট বলেন, ‘কেবল ভোগ (ফ্যাশন ম্যাগাজিন) দিয়ে আপনি আপনার সমগ্র দর্শকশ্রেণির কাছে পৌঁছতে পারবেন না। এজন্যে বিনোদন আর প্রচার একই বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। এখন তাই আমাদের সামনে এমন সব মাধ্যম উন্মোচিত হয়েছে যেখানে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর গল্প রচনা করা যাবে।’
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট


কালো ঝলমলে পোশাকে রেড কার্পেট মাতালেন তারকারা 
