আজকালকার মিষ্টির তালিকায় পেঁয়াজ বা রসুনের নাম শুনলেই ভুরু কুঁচকে যায়। কিন্তু আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, মেসোপটেমিয়ার রাজপ্রাসাদে দেদারসে তৈরি হতো এমন এক মিষ্টি। যার নাম মেরসু। অবাক করা ব্যাপার হলো, সেই মিষ্টির অন্যতম উপকরণ ছিল পেঁয়াজ ও রসুন।
মেসোপটেমিয়ার রাজা জিমরি-লিম মেরসুর এতটাই ভক্ত ছিলেন যে, তার প্রাসাদে কেবল এই একটি মিষ্টি তৈরি হতো। আর তার জন্য তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন আটজন বিশেষ রাঁধুনি। তাদের নাম ছিল ‘শা মেরসিম’। অতিথি এলে বা কোনো ভোজসভা হলে এই রাধুনিদের কাজের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। রান্নাঘরের বড় বড় পাত্রে একসঙ্গে ৪০ লিটার মিশ্রণ তৈরি হতো মেরসুর জন্য।
মেরসুর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ সালের দিকে সুমেরীয় শহর উরে এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে গবেষকরা মনে করেন, এটি আরও পুরোনো হতে পারে। আক্কাদীয় ভাষায় ‘মেরসু’ শব্দটি এসেছে ‘মারাসু’ থেকে, যার মানে ‘মেশানো’। তাই উপাদান মিশিয়ে তৈরি এই ডেজার্টের নাম হিসেবে মেরসু বেশ মানানসই।
মুল উপাদান ছিল ময়দা ও ঘি। এর সঙ্গে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও অনেক কিছু। যেমন, খেজুর, কিসমিস, আপেল, পেস্তা, জিরা, ধনে, এমনকি বিয়ারও। আর যেটা সবচেয়ে চমকপ্রদ, তা হলো পেঁয়াজ-রসুন। এখনকার মতো সেই সময়ে খাবারকে মিষ্টি নাকি ঝাল, এভাবে ভাগ করা হতো না। অনেক উপাদানই ব্যবহার হতো স্বাদ এবং ওষুধি গুণের কারণে। পেঁয়াজ-রসুন মেরসুতে ছিল কি না শুধুই গন্ধের জন্য, নাকি তারা স্বাদের জটিলতা বাড়াত। সেটা নিয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
মেরসু দেখতে কেমন ছিল তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই। কেউ বলেন, এটি ছিল মিষ্টি রুটি, কেউ বলেন পুডিংয়ের মতো কিছু। আবার কেউ মনে করেন, এটি ছিল একধরনের প্রাচীন কেক। জিমরি-লিমের প্রাসাদের রান্নাঘর থেকে প্রায় ৪৮টি কেকের ছাঁচ পাওয়া গেছে। যা ইঙ্গিত দেয় মেরসু নানা আকারে বানানো হতো। তবে একটি সুমেরীয় প্রবাদ বলছে, ‘মাঝে কোনো কেক বেক হয় না’। যা থেকে অনুমান করা যায়, এটি ছিল হয়তো বাইরের দিকে শক্ত, ভেতরে তুলনামূলক নরম কোনো কনফেকশন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই মিষ্টি শুধু কোনো একটি সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। মেরসু প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে বিভিন্ন যুগের মানুষ খেয়ে এসেছে। এমনকি এটি নব্য-আসিরীয় যুগেও জনপ্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে এর উপাদান বদলেছে, অঞ্চলের ভেদে হয়তো স্বাদেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবু এটি টিকে ছিল। যা প্রমাণ করে, এটি কোনো সাধারণ খাবার ছিল না। বরং এক ঐতিহ্যবাহী স্বাদের নিদর্শন।
আজকাল অনেক গবেষক মেরসুর আধুনিক সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছেন। কেউ বানাচ্ছেন ডেট-পেস্টা ভর্তি কুকি, কেউ বানাচ্ছেন খামিরে ভরা কেক। তবে অধিকাংশ রেসিপি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। হয়তো এর মাধ্যমেই হারিয়ে যাচ্ছে মেরসুর সেই আসল রহস্যময় স্বাদ।


তিব্বত থেকে ফিলিপাইন, বিশ্বজুড়ে রয়েছে অদ্ভুত সব চায়ের কাহিনি
ঘরেই বানাতে পারেন সুস্বাদু আলফ্রেডো টরটেলিনি, রইল রেসিপি
